যুদ্ধের মুখে ইয়েমেন!

হুথিদের শেষ দেখে ছাড়ার ঘোষণা নিয়ে ময়দানে নামল কে?

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪০ এএম

চার বছরের আপাত শান্তির পর ইয়েমেনে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বিদ্রোহীদের ব্যাপক তৎপরতা ও সেনা সমাবেশ দেখতে পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি লোহিত সাগরে দুটি সৌদি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে তার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা। বিদ্রোহীদের দাবি, জাহাজ দুটি সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপর তাদের আরোপিত অবরোধ অমান্য করেছিল। একই সময়ে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ধালে প্রদেশের ফ্রন্টলাইনে হুথি ও সরকার সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ঘটে, যাতে উভয় পক্ষের ৩০ জনেরও বেশি হতাহত হয়।

এই দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে হুথিরা শুধু হুমকির মুখেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সরাসরি সামরিক অভিযানে নেমে পড়েছে। গত কয়েক বছর সামরিক জয়ের পর বিদ্রোহীরা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীসহ তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে পুরোপুরি সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

হুথিরা নিজেদের শক্ত অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। গত এক দশক ধরে ইয়েমেন সরকার, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইসরায়েলের মতো শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেও তারা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের জনবহুল উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আত্মবিশ্বাস তাদের জন্য ভুল প্রমাণিত হতে পারে। কারণ গত চার বছরে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইয়েমেন সরকারের অধীনে হুথি-বিরোধী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ইয়েমেনে হুথিরা এখনো বেশ প্রভাবশালী এবং তাদের বড় সামরিক শক্তি রয়েছে, তবে সামগ্রিক কৌশলগত পরিবেশ স্পষ্টতই বদলে গেছে। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে এবার হুথিদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।

ঐক্যবদ্ধ সরকার ও পরিবর্তিত আঞ্চলিক সমীকরণ

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা সানা দখল করে এবং দুর্বল সামরিক বাধা ও রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে দেশের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীদের উত্থানে সরকার ভেঙে পড়ে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদিসহ অনেক নেতা জীবন বাঁচাতে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোট সরকার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সরাসরি এতে যুক্ত থাকে।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধ হুথিদের সংকল্প বা তাদের দখল করা এলাকা কমাতে পারেনি। আরব জোটের দুই প্রধান সদস্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নিজস্ব স্বার্থের সংঘাত এবং ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে হুথিরা এতদিন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল।

তবে গত বছরের শেষের দিকে ইয়েমেন সরকার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনীকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, সৌদি আরব সামরিক সহায়তা দিয়ে দক্ষিণে আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ‌‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’কে কোণঠাসা করেছে। এর ফলে সরকার যুদ্ধের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আহমেদ নাগি আল জাজিরাকে জানান, সরকারি ক্যাম্পের এই সংহতি যুদ্ধের গতিপথ হুথিদের প্রতিকূলে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই এর কিছু নমুনা দেখতে পাচ্ছি। চলতি বছরের শুরুর দিকের তুলনায় জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং সামরিক সিদ্ধান্তগুলো সমন্বিতভাবে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরবও মাঠে প্রধান ভূমিকা রাখছে এবং হুথি-বিরোধী বিভিন্ন উপদলগুলোর সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করছে।’

নাগির মতে, যদি ইয়েমেন সরকার উন্নত সমন্বয় ও সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তবে তা হুথিদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে এবং মাঠের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে।

অ্যালাইন্ড উইথ ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইয়েমেনি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক মারওয়ান আলী নোমান জানান, সানার পূর্বে আল-জাউফ এলাকায় হুথি-বিরোধী উপজাতীয় বা গোত্রীয় জোটের উত্থান বিদ্রোহীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। একই সাথে সরকারের অধীনে সামরিক বাহিনীর ঐক্য এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হুথিদের হুমকির প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হুথি-বিরোধী পক্ষকে শক্তিশালী করেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজে আক্রমণ চালিয়ে হুথিরা এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে তাদের সক্ষমতা দেখালেও, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রত্যাহারের পর সরকারি বাহিনী রাজনৈতিক ঐক্য, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বহিরাগত সমর্থন জোরদার করেছে।

নতুন আঞ্চলিক জোট ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল হুথিরা। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে শত শত বিমান হামলা চালায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতার পর জাহাজ হামলা বন্ধ করেছিল হুথিরা।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা ব্যবস্থাপক ইয়াজিদ আল-জেদাবি বলেন, হুথিরা যদি সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় দীর্ঘমেয়াদী হামলা শুরু করে, তবে এবার তাদের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখতে হতে পারে।

তিনি জানান, বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষায় নতুন আঞ্চলিক জোট গঠন ত্বরান্বিত হতে পারে এবং ২০২২ সাল থেকে শান্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে পুনর্গঠিত হওয়া ইয়েমেনের স্থানীয় পদাতিক বাহিনীকে আরও বড় ধরণের সহায়তা দেওয়া হতে পারে।

সম্প্রতি লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেল ট্যাঙ্কারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও হুথিদের বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের সামরিক শাস্তির’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘হুথিরা যদি আবার এমন কাজ করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করবে; কারণ হুথিরা মূলত ইরানেরই একটি প্রক্সি বা অনুগত গোষ্ঠী।’

অন্যদিকে, হুথিরা বাজি ধরছে যে সৌদি আরব বা আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে হামলা সহ্য করতে পারবে না এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইবে।

অভ্যন্তরীণ অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ ও গোত্রীয় বিদ্রোহ

সম্প্রতি আল-জাউফ প্রদেশের এক গোত্রপ্রধান হামাদ আল-হাজমি হুথিদের সাথে বিরোধের জেরে সানায় ৫০ দিন বন্দি ছিলেন। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্ত হয়ে তিনি ইয়েমেনের নিজস্ব গোত্রে ফিরে যান এবং তার ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এর প্রতিবাদে এই মাসে বিভিন্ন প্রদেশের হাজার হাজার উপজাতীয় লোক আল-জাউফে একত্রিত হয়ে প্রকাশ্যে হুথি কর্তৃপক্ষের তীব্র নিন্দা জানায়।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ক লেখক ফুয়াদ মুসেদ বলেন, ‘আমার মতে, দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি ও বিভাজন সত্ত্বেও ইয়েমেনের ইতিহাসভিত্তিক শক্তিশালী গোত্রগুলো এবার যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, তা হুথিদের জন্য অত্যন্ত অভূতপূর্ব এক চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ আবার শুরু হলে এই গোত্রীয় জোট সরকারি বাহিনীকে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে।’

তবে ইয়াজিদ আল-জেদাবি মনে করেন, এর সফলতা নির্ভর করবে এই গোত্রীয় জোট কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তারা সরকারি বাহিনীর সাথে কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে পারে তার ওপর। ২০১৭ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর অনুগত সামরিক বাহিনীকে হারানোর পর হুথিরা এত বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আর হয়নি।

সানার অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, হুথি অনুগত সামরিক বাহিনীতে ২ লাখেরও বেশি যোদ্ধা রয়েছে এবং তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আরও হাজার হাজার তরুণকে যুদ্ধে নামাতে সক্ষম।

জেদাবি সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকারের অনুকূলে থাকলেও ইয়েমেনের ক্ষমতার ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি। হুথিদের একক কমান্ড বা নেতৃত্ব, সুরক্ষিত ঘাঁটি, বিশাল যুদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বড় সুবিধা এখনো রয়েছে। ফলে সরকারি বাহিনী আগের চেয়ে শক্তিশালী হলেও এই মুহূর্তেই কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত