এক অভিযোগে উত্তপ্ত রাবি, সংঘর্ষ, তদন্ত কমিটি, গ্রেপ্তার ২

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

এক নারী শিক্ষার্থীর করা লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে একের পর এক ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। অভিযোগের পরদিন অভিযুক্তকে প্রক্টর দপ্তরে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শুরু হয় উত্তেজনা। পরে তা দফায় দফায় রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় হামলা, ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। 

এ ঘটনায় হামলার অভিযুক্ত হিসেবে দুই সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

রোববার (২৬ জুলাই) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন সংস্কৃত বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এক নারী শিক্ষার্থী। 

অভিযোগে তিনি একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ধারাবাহিকভাবে মানসিক হয়রানি, ছুরি প্রদর্শন, আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরদিন অভিযুক্ত মহসিনকে প্রক্টর দপ্তরে হাজির হতে বলা হয়।

অভিযোগ থেকে সংঘর্ষ

সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে অভিযুক্ত মহসিন আলম প্রক্টর দপ্তরে গেলে সেখানে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ওই নারী শিক্ষার্থীর দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী ৪ জন অভিযুক্তকে নিয়ে আলোচনার সময় সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী অভিযুক্ত আনাস সেখানে উপস্থিত হন।

তিনি দাবি করেন অভিযুক্ত মহসিনের গার্ডিয়ান হিসেবে তিনি এখানে এসেছেন। কিন্তু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান তার সাথে পরে কথা বলবে জানালেও আনাস যেতে চাননি। এক পর্যায়ে তিনি প্রোক্টরিয়াল বডির কয়েকজনের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ান।

ঘটনা জানতে পেরে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বিরসহ রাকসুর কয়েকজন নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হন। 

ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী হিসেবে আনাসের নামে অভিযোগ পাওয়ায় সালাহউদ্দিন আম্মার তার ফোন চেক করেন এবং ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য বের করেন। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থীও তাকে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করেন। এক পর্যায়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজনের সঙ্গে সেখানে হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর কয়েকজন সহযোগীকে (৭-৮ জন) নিয়ে আনাস রাকসু কার্যালয়ে গিয়ে হামলা চালান। হামলায় রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। এরপর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অভিযুক্তদের ধাওয়া করলে সংঘর্ষ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

রাকসুতে হামলাকারীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এসে আশ্রয় নিলে সেখানে প্রবেশ করে রাকসু এবং ছাত্রশিবিরের কয়েকজন। এক পর্যায়ে গ্রন্থাগারের মধ্যে গিয়ে হামলাকারীদের মারধর করেন তারা।

একপর্যায়ে হামলাকারীর মধ্যে থেকে একজন আহত হলে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর সেখান থেকে নামিয়ে আবারও মারধর করেন নেতাকর্মীরা।

রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, "প্রক্টর অফিস থেকে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা রাকসু ভবনে এসে হামলা চালায়। বাধা দিতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয়।"

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, "তারা প্রক্টর অফিস থেকে গিয়ে ৪/৫ মিনিটের মধ্যে রাকসুতে হামলা করে। আমরা তখন মাত্র ৩ জন উপস্থিত ছিলাম সেখানে। কোনো ধরনের কথা না বলেই তারা হামলা চালায়।"

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা ঠিক হবে না। তিনি আরও দাবি করেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী নন।

দুইজন গ্রেপ্তার, তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি

সংঘর্ষের পর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের ভিত্তিতেই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো দুর্বল তদন্ত করা হবে না।

এরই ধারাবাহিকতায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২ কে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ বলেন, তদন্ত কমিটি প্রক্টর দপ্তর, রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার পরিদর্শন করবে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনাগুলোতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে। ইতোমধ্যে কমিটি প্রাথমিক বৈঠক করেছে। পর্যায়ক্রমে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সে অনুযায়ী আনাস ও হাসান নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত