টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া: পরিবেশ রক্ষার বার্তা নিয়ে হাঁটছেন ফাহিম, এখন নীলফামারীতে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম

"এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে, চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাবো"- একসময় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হীরে মানিক-এর এই গানের চরণ যেমন এগিয়ে চলার সাহস আর স্বপ্নের কথা বলেছিল, তেমনি সেই বার্তাকেই যেন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৬ বছরের তরুণ যুবক ফাহিম মুনতাসির। যানবাহনের কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার আহ্বান জানানো এবং মানুষকে হাঁটার অভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি একাই হেঁটে চলেছেন কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে দেশের সর্বউত্তরের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া পর্যন্ত।

মঙ্গলবার(২৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফাহিম এসে পৌছেন উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারী শহরে।

আর একদিন পর বৃহস্পতিবার(২৯ জুলাই) তিনি পৌছে যাবেন তেঁতুলিয়া।

১০ জুলাই ফাহিম হাটা শুরু করে চট্রগ্রাম, ফেনি, কুমিল্লা, ঢাকা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, রংপুর হয়ে হেটে ১৯ তম দিনে নীলফামারী পৌছান। এক হাজার কিলোমিটার পথ হেটেই তিনি পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে তিনি নীলফামারী প্রেসক্লাবে এসে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার পায়ে হেটে পথচলার সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন।

ফাহিম জানান, তিনি সহ তিনজন মিলে টেকনাফ থেকে হাঁটা শুরু করেন। পরে ফেনীতে এসে তার দুই সহযাত্রী হাঁটা থামিয়ে দেন। এরপর থেকে একাই হাঁটছেন তিনি। এই পদযাত্রায় তিনি মানুষকে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করছেন। একই সঙ্গে জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বার্তাও দিচ্ছেন।


ফাহিম মুনতাসিরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। স্কুলে পড়াকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক সংগঠন সোনালী সকালের সভাপতি ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি-এর যুব প্রধান। বিভিন্ন সময় প্রকৃতি সুরক্ষা ও জলাধার ভরাটবিরোধী নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন।

ফাহিম জানায়, কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে যাত্রা শুরুর পর আজ মঙ্গলবার নীলফামারী এসেছেন।

পদযাত্রার বিষয়ে তিনি বলেন, ১০ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফ শাপলা জিরো পয়েন্ট থেকে রওনা দিয়েছি। পথে কত জেলা, উপজেলা ইউনিয়ন পৌরসভা এলাকাগুলো পর্যবেক্ষন করেছি। মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিবেশ সম্পর্কে তাদের সচেতন করেছি।
তিনি আরও বলেন, 'কালো ধোঁয়া আর নয়, হেঁটেই করব দূরত্ব জয়' এই স্লোগানে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পদযাত্রা আমি ২০দিনে শেষ করার চিন্তা করেছি। আজ ১৯ তম দিনে ১৪ তম জেলা উত্তরের নীলফামারীতে এসে পৌছিয়েছি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে পঞ্চগড় জেলার তেতুঁলিয়া জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পৌছে আমার ১০ জুলাই শুরু হওয়া এই ২০দিনের পথযাত্রার সমাপ্তি ঘটবে। এই পদযাত্রার উদ্দেশ্য কোনো রেকর্ড গড়া বা ব্যক্তিগত প্রচারণা নয়। মানুষের মধ্যে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

পরিবেশ সম্পর্কে ফাহিম বলেন, বর্তমানে আমরা জ্বালানীর উপর নির্ভর হয়ে পড়েছি। বাসা থেকে বের হয়ে কিছুদূর যেতে আমরা জ্বালানীচালিত যানবাহনের ব্যবহার করছি। এতে শুধু নিজের স্বাস্থ্যের নয়, বরং পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাই ছোট্ট কাজের প্রয়োজন হলেও সকলকে প্রতিদিন অন্ত্যত ৫ কিলোমিটার অথবা ১০ হাজার কদম হাটা উচিত।

তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি বৃক্ষরোপণ করলেও সঠিক পরিচর্যা ও জনসচেতনতার অভাবে অনেক গাছই টিকে থাকে না। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের সবার। পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যদি কোথাও একটি গাছ কাটা হয় সেখানে তিনটি গাছ লাগাবেন। সুস্থ সুন্দর পরিবেশ থাকলে মানুষ সহ বিভিন্ন পশু-পাখি, বন্যপ্রাণীরাও বেঁচে থাকবে।

ফাহিম বলেন, আমি চাই মানুষ আমাকে নয়, আমার বার্তাকে মনে রাখুক। হাঁটা একটি সুস্থ জীবনের ভিত্তি, আর পরিবেশ রক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব।

পরিবেশবাদী এই তরুণের বিশ্বাস, বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একজন মানুষের ছোট একটি পদক্ষেপ থেকেই। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হেঁটে তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন পরিবেশবান্ধব জীবনযাপারের বার্তা। যেন গানের সেই চরণই বাস্তবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- "এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে, চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাবো।" 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত