ঝুম বৃষ্টিতে ঝরনার প্রান্তে না গেলে, সারা বছরের ভ্রমণের তৃপ্তিই আসে না মনে। সেই তৃপ্তি মেটাতেই হুট করেই এক সন্ধ্যায় আদি ঢাকা থেকে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা মাইক্রোতে চেপে বসি। যেতে যেতে মহিপাল ব্রেক। আগেই স্কুল বন্ধু লেলিনের আব্দার ছিল রাতটা যেন ওর বাড়ি দাগনভূঞায় থেকে যাই। তাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী মহিপাল থেকে ডানে মোড় ঘুরিয়ে গাড়ি ছুটল উত্তর আলীপুর গ্রামের পথে। মাইক্রো চলতে চলতে বেকের বাজার হয়ে বাগেরহাট সড়কে ঢুকে যায়। দুপাশে গাছ দিয়ে সীমানা প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে। এ রকম নৈসর্গিক পরিবেশে চলতে চলতে, সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ জনৈক ব্যক্তির টর্চের ইশারায় গাড়ি থামে। এবার সেই চিরচেনা মাটির গ্রামীণ রাস্তা। এক পা ফেললেই দুই পা এগিয়ে যায়, এ রকমটা চলতে চলতেই বন্ধুর বাড়ি পৌঁছে যাই। দেরি না করে ভরপেট খাওয়া দাওয়া শেষে বারবিকিউর প্রস্তুতি। কয়লায় আগুন জ¦ালাতে আর মুরগির টুকরায় হাতপাখার বাতাস করতে করতেই রাত পার। ফজর পড়েই গ্রাম ঘুরতে বের হয়ে যাই। ঘুরতে ঘুরতে মুহুরী নদীর ওপর বাগেরহাট ব্রিজে এসে থামি। মুহুরী নদী ছোট ফেনী নদী নামেও বেশ পরিচিত। উত্তর আলীপুর গ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আর আন্তঃসীমান্ত নদী মুহুরীর মোহনীয় রূপ সঙ্গী করে, ছুটলাম এবার সীতাকুন্ডের পথে। সকালের সড়ক ফাঁকা পেয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই বাড়বকু- বাজারে। গুদাম ঘরের পাশে গাড়ি পার্ক করে এবার শুরু হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমেই চোখে পড়ে পৌরাণিক কাহিনি গাথা মন্দির বাড়বকুন্ড। ভেতরে প্রবেশ করে অগ্নিকু-ের সম্মুখে দাঁড়াই। স্বচ্ছ পানি বুদবুদ করতে দেখলেও, পানির ওপর কোনো আগুন জ¦লার দৃশ্য চোখে পড়েনি। পানির বুদবুদ ব্যাপারটা অলৌকিক কিছু নয়। শুধমাত্রু মিথেন গ্যাসের চাপ। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মন্দিরটা ঘুরে দেখি আর ছবি তুলি।
তারপর শুরু বাড়বকুন্ড ঝরনায় যাওয়ার মূল ট্রেইল। যেদিকে চোখ যাচ্ছে সবুজ আর সবুজ। গাছের লতাপাতা সব চকচকে সবুজ। পাথুরে ঝিরির টলটলে পানি। নান্দনিক ক্যাসকেড। নৈঃশব্দের মধ্যে কলকল শব্দ তোলা ঝিরিতে অবিরাম বয়ে চলা ঝরনার পানি। অনুকূল ও প্রতিকূলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা। কোথাও-বা সাঁতরে খুম পাড়ি দেওয়া। হাইকিং করার ফাঁকে ফাঁকে ঝিরির গায়ে থাকা পাথরে বসে খানিকটা সময় জিরিয়ে নেওয়া। একসময় ধরা দেয় ক্ষিপ্রগতিতে গড়িয়ে পড়া পানির ধারার বাড়বকুন্ড ঝরনার বিশালতা। সেদিন ছিল ক্ষণে ক্ষণে ঝুম বৃষ্টি। মেঘ-বৃষ্টিতে ঝরনার যৌবন ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তখন এর সৌন্দর্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ঢের আকর্ষণীয়। প্রায় ষাট ফিট উচ্চতার বাড়বকু- ঝরনার শুভ্র পানির ধারা গড়িয়ে পড়ার মনোরম দৃশ্য, যা শুধুমাত্র মননেই ধারণ করা যায়। চওড়া ঝরনাটার গায়ে বসে মনের আনন্দে সময় পার করে দেওয়া যায় অবলীলায়। এর ওপরে রয়েছে আরও একটি ঝরনা। আমাদের কেউ কেউ সঙ্গে নেওয়া রশি বেয়ে তরতর করে সেখানটাতে উঠে যায়। ইচ্ছে মতো বাড়বকুন্ড ঝরনার পানিতে ভিজে, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতি পথ ধরি।
ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
