গ্রেনেডে ডান হাত হারিয়ে ২০০ জাপানি সেনাকে ঠেকালেন গোর্খা যোদ্ধা

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

১৯৪৫ সালের বসন্তে বার্মার তাউংদাউ এলাকায় একটি দুর্গম চৌকি রক্ষার দায়িত্বে ছিল অষ্টম গুর্খা রাইফেলসের চতুর্থ ব্যাটালিয়ন। সে সময় প্রায় ২০০ জাপানি সেনা রাতের অন্ধকারে চৌকিটিতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। তখন ৩২ বছর বয়সী লছিমন গুরুং আরও দুই গোর্খা সেনার সঙ্গে সামনের একটি পরিখায় (শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য প্রাসাদ দুর্গ) অবস্থান করছিলেন। শত্রুরা একের পর এক গ্রেনেড ছুড়তে শুরু করলে গুরুং প্রথম দুটি গ্রেনেড ধরে আবার তাদের দিকেই ছুড়ে দেন। কিন্তু তৃতীয়টি তার পায়ের কাছে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এতে তার ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়, বাহু চূর্ণবিচূর্ণ এবং মুখ ও শরীরের ওপরের অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। পাশে থাকা দুই সহযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

তবে রক্তাক্ত ও আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও গুরুং পিছিয়ে যাননি। তিনি লি এনফিল্ড রাইফেলটি বাঁ বাহুর নিচে আটকে পরিখার দেয়ালে ঠেকিয়ে এক হাতে গুলি চালাতে শুরু করেন।

জাপানি সেনারা মনে করেছিল, অবস্থানটি ইতোমধ্যে তাদের দখলে চলে এসেছে। তাই তারা বারবার এগিয়ে আসছিল। কিন্তু অন্ধকারে প্রতিটি নড়াচড়ার জবাব গুলিতে দিচ্ছিলেন গুরুং। টানা চার ঘণ্টা তিনি একাই সেই ছোট্ট অবস্থান ধরে রাখেন। গুলি চালানোর সময় তার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল গুর্খাদের প্রাচীন যুদ্ধধ্বনি, ‘আয়ো গোরখালি!’

ভোর হলে তার পরিখার সামনে ৩১ জাপানি সেনার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিজের এক হাত হারিয়েও তিনি এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়েননি।

সহযোদ্ধারা পৌঁছানোর পরও আক্রমণ পুরোপুরি প্রতিহত না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে নড়েননি তিনি। তাঁর প্রতিরোধে পুরো কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রক্ষা পায় এবং এমন একটি অগ্রযাত্রা ঠেকানো সম্ভব হয়, যা শত শত প্রাণ কেড়ে নিতে পারত।

অসাধারণ সাহসিকতার জন্য লছিমন গুরুংকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বীরত্বের সম্মান ভিক্টোরিয়া ক্রস দেওয়া হয়। পরে তিনি সুস্থ হয়ে নেপালে ফিরে যান এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। এক হাত ও অদম্য মনোবল নিয়ে অসম্ভব লড়াই জেতা গুর্খা যোদ্ধা হিসেবে তার নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

গোর্খা যোদ্ধা

গোর্খা নেপাল ও উত্তর ভারতের একটি জাতিগোষ্ঠী। গোর্খা নামটির উৎপত্তি অষ্টম শতাব্দীর হিন্দু যোদ্ধা-সন্ত গুরু গোরক্ষনাথের নাম থেকে। তার শিষ্য বাপ্পা রাওয়াল (জন্মগত নাম যুবরাজ কালভোজ বা যুবরাজ শালিয়াধীশ) রাজপুতানার (রাজস্থান) মেবার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। বাপ্পা রাওয়ালের পরবর্তী উত্তরাধিকাররা আরও পূর্বে চলে এসে গোর্খা বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। গোর্খা বংশ পরে নেপাল রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিল। আধুনিক নেপালের ৭৫টি জেলার মধ্যে অন্যতম হল গোর্খা জেলা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্ট ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেড অফ গুর্খায় গোর্খারা তাদের সাহসিকতা এবং শক্তিমত্তার ইতিহাসের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। ব্রিটিশ আধিকারিকেরা গোর্খাদের  ‘মার্শাল রেস’ বা যোদ্ধা-জাতির মর্যাদা দেওয়া হয়। ব্রিটিশ ভারতে যুদ্ধপ্রিয়, আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন, সাহসী, অনুগত, সুশৃঙ্খল, শক্তিমান ও কর্মঠ জাতিগুলিকে ‘মার্শাল রেস’এর মর্যাদা দেওয়া হত। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এই সকল মার্শাল রেস থেকে প্রচুর সংখ্যক সৈনিককে নিয়োগ দেওয়া হত। (তথ্য: উইকিপিডিয়া)   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত