মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। যুক্তরাষ্ট্রও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে, একই দিনে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এসব ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জর্ডানে যা ঘটেছে
বুধবার ভোরে আইআরজিসি জানায়, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কোন কোন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। জর্ডান কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু প্রকাশ করেনি।
আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
ইরাকে যে কারণে হামলা
একই দিনে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাবে সেন্টকমের সমন্বয়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, গত ৭২ ঘণ্টায় ইরানের নির্দেশনায় পরিচালিত অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সৌদি জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরাকে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে ইরান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে বলেছেন, এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা ‘বড় ধরনের ভুল হিসাব’।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।
বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভেহ, বসরা, কিরকুক, কারবালা ও দিয়ালা প্রদেশে তাদের বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
ঘটনার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন এবং ড্রোন হামলার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
কেন জর্ডানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হলো
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে তেহরান।
মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাদের একটি অংশ মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, কিং ফয়সাল বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তবর্তী টাওয়ার-২২ ঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক বুরচু ওজচেলিকের মতে, ইরান এখনো বিশ্বাস করে যে সক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিষয়টিও তেহরানের কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধ কি আরও ছড়িয়ে পড়বে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা ও অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেন ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজে হামলার দাবি করেছে।
এ অবস্থায় সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদও সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাসও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সংঘাত সাময়িকভাবে কমে এলে মধ্যস্থতাকারীদের জন্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দীর্ঘমেয়াদে আলোচনার টেবিলে ফিরতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।
