জাপানের উপকূলীয় শহর ফুজিসাওয়ায় প্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। টোকিও থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত শান্ত ওই উপকূলীয় শহরে প্রস্তাবটি সামনে আসার পর থেকেই বিক্ষোভ, উদ্বেগ এবং জনমত বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নরিকো ইজুমিজাওয়া বলেন, এটি আমাদের সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ কীভাবে বদলে দেবে, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এনিয়ে চলতি বছরের শুরুতে শহরের রেলস্টেশনের কাছে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের অন্যতম আপত্তি ছিল, প্রস্তাবিত মসজিদটি কাছাকাছি অবস্থিত একটি শিন্তো মন্দিরের তুলনায় অনেক বড় হবে এবং এলাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
ইজুমিজাওয়া তাদেরই একজন, যারা মনে করেন এলাকায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার ফলে সামাজিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে চলমান বিতর্ক তার উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, প্রায় ৩৯ বছর ধরে জাপানের ওসাকায় বসবাসরত শ্রীলঙ্কান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিদীন বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বেড়েছে।
তার ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ‘জাপান ছেড়ে চলে যাও’, ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’- এ ধরনের মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। এমনকি কিছু মানুষ মসজিদে এসে গালিগালাজও করছে।
তিনি জানান, তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের কখনও কখনও ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং বিস্ফোরক তৈরির অভিযোগও তোলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনই এই উত্তেজনার অন্যতম কারণ। ২০২৫ সালে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ কমে যায়। একই বছর প্রথমবারের মতো জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রেকর্ড ২৫ লাখ ৭০ হাজার বিদেশি নাগরিক জাপানে কর্মরত রয়েছেন। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা ২০১৯ সালের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বৃহৎ পরিসরে অভিবাসন গ্রহণের বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রেখেছেন।
এনিয়ে চলতি বছরের জুনে তার সরকার বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ফি পাঁচ গুণ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, যা প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথম বৃদ্ধি। পাশাপাশি অভিবাসন আইন প্রয়োগে অতিরিক্ত প্রায় ২৩০ জন জনবল নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
তবে মহিদীন মনে করেন, মুসলিম সম্প্রদায়েরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, অনেক মুসলিম জাপানি সমাজের সঙ্গে যথেষ্টভাবে মিশে যেতে পারেননি এবং নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে স্থানীয়দের সঠিক ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি বলেন, এখন থেকে আমি আরও বেশি সংলাপ বাড়াতে চাই, যাতে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও শক্তিশালী হয়।
সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াশিও মসজিদের প্রতিনিধি, ৬১ বছর বয়সী পাকিস্তানি নাগরিক শাকিল মোহাম্মদ বলেন, জাপানে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য স্থানীয় আইন-কানুন ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আবর্জনা সঠিকভাবে আলাদা করা থেকে শুরু করে পার্কিংয়ের নিয়ম মানা- সব ক্ষেত্রেই আমরা জাপানের নিয়ম-কানুন মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।
অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ফেরদৌসি শাহরিয়ার মারা গেছেন