মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর একটি অতর্কিত হামলা চালানোর চেষ্টার কঠোর প্রতিশোধ নিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রকম্পিত সামরিক হামলা চালানো শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তথ্যটি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ইরানের চালানো আক্রমণের পাল্টা জবাব হিসেবেই এ ‘শক্তিশালী ও প্রকম্পিত’ আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এমন এক সময়ে আরও ছড়িয়ে পড়লো, যার ঠিক একদিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন-সৌদি যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়। গত মঙ্গলবার ইরাকে অবস্থিত ইরান সমর্থিত বিভিন্ন প্রক্সি বা সহযোগী মিলিশিয়া গোষ্ঠীর অবস্থান লক্ষ্য করে এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছিল, যা চলমান সংকটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে প্রথম সামরিক হামলা শুরু করে, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোর দিয়ে দাবি করেছিলেন যে এই সংঘাতের স্থায়িত্ব হবে বড়জোড় মাত্র কয়েক সপ্তাহ। তবে দেখতে দেখতে সেই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই দীর্ঘ পাঁচ মাসে গড়িয়েছে এবং আপাতত এর কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি বা কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্মণ দৃশ্যমান হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক এই বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর আসার ঠিক কয়েক দিন আগে মধ্যপ্রাচ্যে আপাতদৃষ্টে এক ধরণের আপেক্ষিক শান্ত পরিবেশ বজায় ছিল। একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায় উভয় পক্ষই টানা কয়েকদিন যাবতীয় আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতা স্থগিত রেখেছিল। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সেগুলোকে "অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা বা সমঝোতা বৈঠক" বলে অভিহিত করেন। যদিও ইরানের রাজধানী তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
গত বুধবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এক অজ্ঞাতনামা মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে এক প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ওয়াশিংটনে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। উক্ত বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিয়াদের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করে জানান, সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বিরাজমান তীব্র উত্তেজনা কমানো এবং সংঘাত প্রশমনের পক্ষে। তবে এই বৈঠকের খবরের সত্যতা ও মন্তব্যের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি মার্কিন প্রশাসনিক কার্যালয় হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বুধবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর নতুন এই হামলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আগের দিন মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর চেষ্টার অপরাধে ইরানকে কঠিন খেসারত দিতে হবে এবং কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত শক্তভাবে আঘাত হানতে যাচ্ছি, কারণ এবার আমাদের আঘাত করার পালা। তারা খুব ভালো করেই জানে কী ঘটতে যাচ্ছে এবং কী তাদের দিকে আসছে। এমনকি তারা আমাদের এই আক্রমণ না করার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছিল।’
অন্যদিক ইরানের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাধর এলিট শাখা ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং সামরিক কমান্ড সেন্টার বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে তারা সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ‘আমেরিকান শিশু হত্যাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক আগ্রাসী ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের সরাসরি প্রতিক্রিয়া বা জবাব হিসেবেই’ এ হামলা চালানো হয়েছে।
একই সাথে ইরানি বাহিনী আরও দাবি করেছে যে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি বিশ্বমানের তেলবাহী ট্যাঙ্কার বা জ্বালানি জাহাজ তাদের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার দেওয়া বার্তা ও সতর্কতা উপেক্ষা করে একটি চরম ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি পথ’ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। যার ফলে ইরানের নৌবাহিনী ত্বরান্বিত পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী ওই তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর টানা ১৩ দিন ও ১৩ রাত ধরে চালানো অত্যন্ত নিবিড় ও প্রকম্পিত বোমা বর্ষণ অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, টানা প্রায় দুই সপ্তাহের সেই বিধ্বংসী হামলায় ইরানের প্রধান প্রধান আধুনিক দূরপাল্লার অস্ত্রভান্ডার এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধ্বংস করা হয়েছিল, যাতে বেশ বহুসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল বলে খবর পাওয়া যায়।
তবে মার্কিন সেন্টকমের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি সপ্তাহের গত মঙ্গলবার মার্কিন ও সৌদি যৌথ বাহিনী পূর্ব ইরাকের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অবস্থিত বেশ কয়েকটি ‘সন্ত্রাসবাদী সামরিক রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং বিপুল অস্ত্রের ডিপো’ লক্ষ্য করে তীব্র আক্রমণ চালায়। সেন্টকম দাবি করে, বিগত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসির প্রত্যক্ষ নির্দেশে মার্কিন ও মিত্র অবস্থানের ওপর পরিচালিত ৩০টিরও বেশি ক্ষতিকর ড্রোন আক্রমণের কঠোর জবাব হিসেবেই এই যৌথ মার্কিন-সৌদি হামলা চালানো হয়।
ইরাকের শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ), যা মূলত ইরান সমর্থিত বিভিন্ন প্রভাবশালী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত, তারা জানিয়েছে যে মার্কিন ও সৌদি সামরিক বাহিনীর যৌথ বোমা হামলায় তাদের বিভিন্ন ঘাঁটিতে অন্তত ২০ জন বীর যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
ইরাকের স্বশাসিত সরকার ও দেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পিএমএফের অবস্থান ও ঘাঁটিতে পরিচালিত এই যৌথ বিমান হামলার তীব্র নিন্দা ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ইরাকি রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ইরাকের অভ্যন্তরে এই ধরনের বোমাবর্ষণ পুরোপুরি ‘অগ্রহণযোগ্য হামলা এবং দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এক নগ্ন ও চরম লঙ্ঘন।’ তবে বাগদাদের এই অভিযোগ ও উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে দাবি করেছেন যে ইরাকের ভূখণ্ডে পরিচালিত এই বিমান হামলাগুলো প্রকৃতপক্ষে ‘ইরাক সরকারের সাথেই সরাসরি সমন্বয় ও আলোচনার মাধ্যমে’ পরিচালনা করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক সংঘাত কেবল আমেরিকা ও ইরানের দ্বিমুখী লড়াই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও ধর্মীয় আধিপত্যের লড়াই। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব নিজেদের সুন্নি মুসলিম বিশ্বের প্রধান নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে ইরান বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এই দুটি পরাশক্তি গত কয়েক দশক ধরে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল জুড়ে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক প্রচ্ছন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, যা বর্তমান মার্কিন মধ্যস্থতা ও সামরিক হস্তক্ষেপে আরও বেশি জটিল ও রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করেছে।
সূত্র: বিবিসি
