ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ১,৩১৬ কোটি টাকা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১১:১৯ এএম

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ১,৩১৬.৪৮ কোটি টাকার রেকর্ড সমন্বিত নিট লোকসান করেছে, যা ব্যাংকটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। 

গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ধারাবাহিক মুনাফার পর এবং ২০২৫ সালের কাগজ-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এসে ব্যাংকটি এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত মুনাফা হয়েছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সা।

প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের পর বুধবার (২৯ জুলাই) এ আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করে ইসলামী ব্যাংক।

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই সময়ের মধ্যে ২০২৩ সালেই সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছিল।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। মূল্য সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, মোট সমন্বিত লোকসানের মধ্যে এপ্রিল-জুনের দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান হয়েছে ১,০২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে এককভাবে বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১,৩২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান নেমে হয়েছে ৮ টাকা ২৪ পয়সা।

ব্যাংকটি জানিয়েছে, আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া, খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়া এবং অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকে আয় হ্রাস পাওয়াই মূলত এই লোকসানের কারণ।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "আমাদের এই লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, ব্যাংকের সম্পদের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপ অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের আমানতের পুরো মুনাফা পরিশোধ করতে হচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মোট আমানত ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে। বাকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সিংহভাগই এস আলম ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়েছে, যা থেকে কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে না।’

সংকট থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করতে যাচ্ছে। তারা যদি এই মন্দ সম্পদগুলো কিনে নেয় অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এস আলমের এই ঋণের অংশ ব্যালান্স শিট থেকে আলাদা রাখার সুযোগ দেয়, তাহলে আমাদের এই সংকট কেটে যাবে।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুই দিনে আমাদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিলে গ্রাহকদের আস্থা আগের চেয়ে অনেক বাড়বে এবং আরও বেশি করপোরেট আমানত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

লোকসানের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি খুব পরিষ্কার। একটি বড় গ্রুপে ইসলামী ব্যাংকের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের অর্থ থেকেই এই বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংককে আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে বিনিয়োগ থেকে আয় আসছে না, অন্যদিকে আমানতকারীদের মুনাফা দিতে হচ্ছে। এ কারণেই লোকসান হয়েছে।’

আলতাফ হোসেন আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় যে অর্থ আদায় হচ্ছে না, সেটিকে আয় হিসেবে দেখানো হয় না; বরং সাসপেন্স হিসাবে রাখা হয়। ভবিষ্যতে এই অর্থ আদায় হলে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ব্যাপকভাবে বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত