বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে খুলনার কয়রা উপজেলার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন। এখান থেকেই প্রতিদিন বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি ও পর্যটকদের একটি অংশ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, বন ও বন্যপ্রাণীর অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাশিয়াবাদ এখনও দেশের পর্যটন মানচিত্রে যথাযথ স্থান করে নিতে পারেনি।
পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপদ নৌভ্রমণ, ইকো-ট্যুরিজম সুবিধা এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কাশিয়াবাদ হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতি-ভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র।
শাকবাড়িয়া নদীর তীরে অবস্থিত কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। এখান থেকে নদীপথে সুন্দরবনের খাল-নদী, ম্যানগ্রোভ বন, হরিণ, কুমির, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতির চিহ্নও দেখা যায়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইকো-ট্যুরিজম এলাকা এবং প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী বনভ্রমণে আসেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আবু সাইদ মোল্লা জানান, শীত মৌসুমে কাশিয়াবাদে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত জেটি, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র, নিরাপদ নৌযান, খাবারের ব্যবস্থা ও আবাসনের অভাবে অনেক দর্শনার্থী দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াছিন আলম বলেন, কাশিয়াবাদকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে উঠলে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান, গাইড সেবা ও স্থানীয় হস্তশিল্পের নতুন বাজার তৈরি হবে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের পর্যটন অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই কাশিয়াবাদে সম্ভাব্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বন বিভাগের ইকো-ট্যুরিজম নীতিতেও নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো, তথ্যসেবা, ওয়াচ টাওয়ার, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে পর্যটকের সংখ্যা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উভয়ই বৃদ্ধি পেতে পারে।
কয়রা উপজেলার উন্নয়ন ও সমস্যা নিয়ে কাজ করা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এইচএম শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, কাশিয়াবাদে একটি আধুনিক পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, নদীতীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে, ইকো-কটেজ, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড এবং নিরাপদ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা চালু করা হলে এটি করমজল বা হারবাড়িয়ার মতো পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি নতুন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য, নদীর নীরবতা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে কাশিয়াবাদ শুধু একটি বন স্টেশন নয় এটি হতে পারে বাংলাদেশের উপকূলীয় ইকো-ট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত। প্রয়োজন শুধু সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও কার্যকর প্রচারণা।
