১ মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ২১৭%

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৬ এএম

দিন দিন ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এখন প্রতিদিনই চারশ থেকে পাঁচশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বছরের প্রথম ছয় মাসে যে পরিমাণ রোগী ভর্তি হয়েছে, গত এক মাসে তার চেয়ে অনেক বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ছয় মাসের তুলনায় এক মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভর্তি রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, এভাবে বাড়তে থাকলে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া না গেলে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ¦র হলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হবে। প্রথম দিনেই পরীক্ষা করাতে পারলে ভালো। পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। দ্বিতীয়বার আক্রান্তদের বেলায় বিশেষ সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, যদি কেউ দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তিনি যেন বাসায় বসে না থাকেন। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সে জন্য শনাক্তের পর থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি থাকা উচিত। চিকিৎসকদের উদ্দেশেও বলেছেন, রোগীর কাছে শুনে নিতে যে তিনি আগে কতবার আক্রান্ত হয়েছেন। দুই বার বা তিন বার আক্রান্ত রোগীদের বাসায় না পাঠিয়ে হাসপাতালে অবজারভেশনে রাখতে হবে। বাসায় পাঠালেই বড় বেশি ভুল হয়ে যাবে। ওই রোগী মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ১৫৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যু হয় একজনের। চলতি বছরের এই পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৩১০ জন। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে ২ হাজার ৯০৭ ও জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন ভর্তি হয়। চলতি বছরে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। এর মধ্যে  জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন,  জুনে ১৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে দিনে পাঁচশর বেশি করে ভর্তি হওয়া শুরু হয়েছে। এই এক মাসে ভর্তি হয়েছে জুলাই মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ২০৬ জন। জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ভর্তি হয় ৬ হাজার ১০৪ জন। এক মাসে ভর্তি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। জুলাই মাসে দিনে গড়ে ২৯৭ জন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। জুন মাসে ভর্তি হয়েছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। জুনের তুলনায় জুলাই মাসে রোগী বেড়েছে ২১৭ শতাংশ। জুলাই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। জুনে হয়েছিল ১৩ জনের। মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু তো বাড়বেই। আমাদের দোষ এটা। আরা যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ না করি, ডেঙ্গু তো বাড়বেই। এগুলো বলে কোনো লাভ নেই। আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। সরকারের সচেতন হতে হবে। তাছাড়া বক্তৃতা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, আমরা যতদিন না ভালো হব, ততদিন দেশ ভালো হবে না। বিষয়টা তাই। ডেঙ্গু বাড়ছে। আরও বাড়বে। আক্রান্ত বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে। কখন পিক সিজন হবে বলা যাচ্ছে না। মাসের হিসাবে হবে না। এটা বর্ষার ওপর নির্ভর করে। দুদিন বৃষ্টি হলো। আবার দুদিন বৃষ্টি হলো না। এই যে দুদিন সময় পেল এই সময়ে পানি জমে বংশবিস্তার করে ফেলল। বর্ষাকালে মশার বংশবিস্তার হয়। আর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়।

বিভাগভিত্তিক ভর্তির দিক থেকে বেশি রোগী বরিশাল বিভাগে। বরিশালে এ বছর এই পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৩১২, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৬৫১, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ২ হাজার ১২৯, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২ হাজার ৫৯, খুলনায় ১ হাজার ৯৪৮, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১ হাজার ৫৯৭, ময়মনসিংহ ৬২০, রাজশাহী ৫৬৬, রংপুরে ৩৩০ ও সিলেটে ৯৭ জন ভর্তি হয়েছে। 

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে গেলে চিকিৎসায় সুবিধা হয়। তখন থেকে গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হলে সেই রোগী সহজে সুস্থ করা সম্ভব হয়। হাসপাতালে নিতে দেরি হলে, চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়। যদি কেউ দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হন, তিনি যেন বাসায় বসে না থাকেন। তাকে অবশ্যই রোগ নির্ণয় হওয়ার পর থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা না দিলেও তাকে হাসপাতালে অবজারভেশনে রাখতে হবে। কারণ দ্বিতীয়বার হলেই মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। হঠাৎ করে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যেতে পারে। সে জন্য হাসপাতালে থাকতে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পায়। বাসায় পাঠালেই কিন্তু রোগী হারাব। মৃত্যুর আশঙ্কায় পড়ে যাবে। ডেঙ্গুর চিকিৎসা কী ধরনের হবে, তা ডাক্তারদের জানা আছে। সেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া আছে। যদি কেউ সেভাবে না করেন, তাহলে তা তার গাফিলতি।

মশা নিধনের ওষুধ মানুষের জন্য জীবন রক্ষাকারী। অথচ এটা নিয়ে কতভাবেই না ব্যবসা করা হয়। তিনি ব্যবসার জন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলা না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটা নিয়েও যদি মানুষ ব্যবসা করে তাহলে কোথায় যাব!

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ভয়াবহ হওয়ায় আশঙ্কা বিরাজ করছে। কীটতত্ত্ববিদরা বছরের শুরুতেই জানিয়েছিলেন দেশে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অনেক বেশি। একজন মানুষের চার বার ডেঙ্গু হতে পারে। ডেঙ্গু আক্রান্ত যতবার হবে তত বেশি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে। প্রথম বারের চেয়ে দ্বিতীয় বার, দ্বিতীয় বারের চেয়ে তৃতীয় বার, তৃতীয় বারের চেয়ে চতুর্থ বার মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এখন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ে।

তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো সমন্বিত কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়নি। মশা বাধাহীনভাবে তার নিজস্ব গতিতে বাড়ছে। আরও দুই থেকে আড়াই মাস ডেঙ্গুর মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সে জন্য আরও আড়াই মাস সতর্ক থাকা দরকার। ডেঙ্গুর ভয়াবহ আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের মানসিকভাবে তৈরি থাকা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত