যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ও ভারতীয় হাইকমিশনারের ‘ইতিবাচক’ বৈঠক

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গোর

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৯ এএম

বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গতকাল শুক্রবার ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বার্তাসংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার একটি হোটেলে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্র বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। সূত্র বলছে, ‘এটি একটি ইতিবাচক বৈঠক ছিল।’ পেশায় ব্যবসায়ী গোর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে রিপাবলিকান পার্টির উদীয়মান নেতাদের একজন। ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে গত বছর তিনি হোয়াইট হাউজে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্বভার গ্রহণ করায় গোর নয়াদিল্লিতে তোলা তাদের ছবি যুক্ত করে গত ২৫ জুন এক এক্স-পোস্টে শুভেচ্ছা জানান। এতে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে আমি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।’

ত্রিবেদী একই দিন এক্সে গোরের শুভেচ্ছার জবাবে বলেন, তিনি গোরের ঢাকা সফরের জন্য অধীর আগ্রহের অপেক্ষায়।

সার্জিও গোর ৩০ জুলাই তিন দিনের সফরে ঢাকা আসেন। সেদিনই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। 

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বৈশি^ক আঞ্চলিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন সফর করে এসেছেন। কূটনীতিকরা বলছেন, চলমান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনের প্রভাব এবং বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নেতিবাচক দিকগুলো গোর ঢাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে একান্ত আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে চাইতে পারেন।

প্রত্যাবাসনের দাবিতে গোরের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ

দেশ রূপান্তরের টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে গতকাল কক্সবাজার সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তার সফরের সময় উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে নাগরিক অধিকারসহ ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন’ নিশ্চিতের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নেন সাধারণ রোহিঙ্গারা।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনসহ ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল উখিয়ার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে। প্রতিনিধিদলটি ক্যাম্পে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কার্যক্রম এবং রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে।

এদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের এই আগমন ঘিরে গতকাল সকাল থেকেই ৪ নম্বর ও সংলগ্ন ৮ ওয়েস্ট (৮ ডব্লিউ) ক্যাম্পে শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থী রাস্তার দুপাশে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। তাদের হাতে ছিল নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আকুল আবেদনসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড।

অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. জোবায়ের বলেন, ‘আমরা এখানে যুগের পর যুগ আশ্রিত হয়ে থাকতে চাই না। যুক্তরাষ্ট্রের বড় কর্মকর্তারা ক্যাম্পে আসায় আমরা তাদের স্পষ্ট জানাতে চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কেবল ত্রাণ দেওয়া নয় বরং আমাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানান,  যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাবিষয়ক সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চেয়েছে। তারা আরও জানতে চেয়েছেন, রোহিঙ্গারা এখনো নতুন করে বাংলাদেশে আসছেন কি না? বাংলাদেশ থেকে কেউ মিয়ানমারে ফিরছেন কি না? মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে কী পরিস্থিতি? ক্যাম্প-সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় জনগণের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক কেমন?

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের আরআরআরসি জানান, এখনো প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে ১০ জন রোহিঙ্গা সংঘাত ও নির্যাতন এড়াতে এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিছু রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। 

সার্জিও গোরের সফর ও সামগ্রিক বিষয়ে আরআরআরসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও খাদ্য সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রধান দাতা দেশের শীর্ষ কর্মকর্তার সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত