ফিরে দেখা জুলাই

‘চেয়েছিলাম সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ’

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানি নেসলে বাংলাদেশ পিএলসিতে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত আছি। আন্দোলনে যুক্ত হই ২০২৪-এর ১৫ জুলাই। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের গুম, খুন, নির্যাতন-নিপীড়ন মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। তখনকার সরকার ক্ষমতাকে পুঁজি করে মানুষের অধিকারকে হরণ করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিল, গণতন্ত্রের কথা বলে স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হয়েছিল। ছাত্রদের ওপর নির্যাতন দেখে, আমার ভাইবোনদের ওপর আঘাত সহ্য করে আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। 

জুলাই গ্রাফিতি, ছবি: উইকিমিডিয়া

১৭ জুলাই সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে ও আমার দুই বন্ধুকে মারধর করে। সেদিন কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও ২০ জুলাই সারাদেশে কারফিউ জারি হয়। সকাল থেকে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় কিছু কিছু মানুষের পায়ে হাঁটাচলা স্বাভাবিক ছিল, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ধনিয়া কলেজের সামনে গেলে, ভয়ে কাজলার দিকে ফিরে আসি। ফুটওভার ব্রিজের নিচে আসতেই আমার সঙ্গে তাইমের দেখা হয়। ওই মুহূর্তে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের ওপর থেকে এপিসি গাড়ি নিয়ে পুলিশ চতুর্দিকে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ শুরু করে।

একটা মুহূর্তে প্রাণে বাঁচতে চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলেও, কিছু পুলিশ সদস্য আমাদেরকে দোকানের সামনে এসে টেনেহিঁচড়ে বের করে। প্রচণ্ডভাবে মারধর করে একটা পর্যায়ে পুলিশ আমাদের দৌড় দিতে বলে। ঠিক ওই মুহূর্তে তাইম দৌড় দেয়। আমি অনেক জোরে ‘না’ বলে চিৎকার দেই। তাকে পেছন থেকে দুটি গুলি করা হয়। প্রথম গুলিটি তার বাম পায়ে লাগে। দ্বিতীয় গুলিটি তার কোমর ভেদ করে সামনে দিয়ে বের হয়ে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায়।

আমি সেই মুহূর্তে পুলিশের সামনে থেকে দৌড়ে এসে তাইমকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। তবুও একজন পুলিশ সদস্য আমাদের দিকে লক্ষ্য করে বারবার গুলি বর্ষণ করে। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার ডান পায়ে একটা গুলি লাগে। তবুও আমি তাইমকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। একটা মুহূর্তে তাইম আমাকে বলে, ‘আমি আর পারতেছি না। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও।’ এই কথার বলার সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ দুটো বন্ধ করে দেয়।

তখন আমার তাকে নেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। আমি তাকে রেখে পেছনের দিকে দৌড় দেই। তখনো আমাকে লক্ষ্য করে পুলিশ চার থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি করে। এক পর্যায়ে আমি মেইন রাস্তায় পড়ে যাই। অনেক জোরে ‘মা’ বলে চিৎকার দেই। দুজন আন্দোলনের সহযোদ্ধা আমার ওই চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে আমাকে রাস্তা থেকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

সরকারিভাবে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে সি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি, এতটুকুই। সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের জন্য এখনো পর্যন্ত জুলাই আহত এবং শহীদ পরিবারের জন্য কোনো রকমের কার্যক্রম বাস্তবায়ন দেখতে পাইনি। সবই কাগজে-কলমে চলমান প্রক্রিয়া।

আমি চেয়েছিলাম একটা সাম্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বাংলাদেশ। ভেবেছিলাম ৫ আগস্ট-পরবর্তী যে নতুন সূর্যোদয়ের বাংলাদেশ হবে, সেখানে থাকবে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। যেখানে কোনো ধরনের গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটবে না।

আমরা শহীদ এবং আহতের বিচার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম, বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার; শুধু মৌখিকভাবে নয়, সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগ। ভেবেছিলাম শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে। সব হাতে কাজ চাই। সব মুখে ভাত চাই। কিন্তু আজ এই স্বপ্ন শুধু কল্পনাতেই বিদ্যমান, আমার সেই স্বপ্ন-আশা-আকাঙ্ক্ষা সবগুলোই যেন স্বপ্নের মতোই রয়ে গেল।

ঠিক দুই বছর পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক। যার হারিয়েছে সেই বুঝে তার যন্ত্রণা। এক শহীদ মায়ের আর্তনাদ বোঝার ক্ষমতা হয়তো এই পৃথিবীর কারও নেই। এই নতুন সরকার তাদের দাঁড়াক, তাদের পরিপূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিক, তাদের খোঁজখবর নিক, তাদের যেকোনো সমস্যায় সরকার যেন সবার আগে এগিয়ে আসে সেটাই প্রত্যাশা করি। এই দেশ এবং সমাজের মানুষের যেই প্রত্যাশা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জনগণের আশা- আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিলে এ সরকার বহুদূর যাবে বলে আমি মনে করি। তাহলেই দেশের সব মানুষের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই একটি সুন্দর সমাজ একটি সুন্দর দেশ পরিচালিত হবে। 
 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত