কয়রার ৩০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, দুর্ঘটনার শঙ্কা

৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আতঙ্কে ক্লাস করছে, জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবনের দাবি

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলায় ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টির ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে ভেতরের রড বেরিয়ে এসেছে, কোথাও পিলার ও বিমে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে তীব্র শ্রেণিকক্ষ-সংকট থাকায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই প্রতিদিন পাঠ নিতে হচ্ছে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থীকে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষ-সংকট কিংবা অস্থায়ী শেডে পাঠদান চলছে—এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩০। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব চৌকুনী, বাঁশখালী, মদিনাবাদ মডেল, নাকশা, ইসলামপুর, জোড়শিং, মদিনাবাদ মধ্যপাড়া, মহেশ্বরীপুর শেখপাড়া, মালিখালী, শহীদ এম গফুর, উত্তর মদিনাবাদ, চৌকুনী কালিকাপুর, বালিয়াডাঙ্গা, বেদকাশী বীণাপাণি, ২ নম্বর কয়রা, দক্ষিণ মঠবাড়ী, দক্ষিণ হড্ডা , বারোপোতা চটকাতলা, গোলখালী, দক্ষিণ ভাগবা, বগা পশ্চিমপাড়া, মঠবাড়ী শান্তিময়ী, ফরেকাটি নারানপুর, মসজিদকুঁড়, কয়রা মনোরমা, ঝিলিয়াঘাটা, বেদকাশী বড়বাড়ী, মহেশ্বরীপুর ও গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সম্প্রতি উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় অনেক ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথাও রড বেরিয়ে এসেছে, কোথাও দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি ভবনের বিম ও পিলারে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। কোথাও আবার পাকা ভবনের পরিবর্তে টিনশেডে ক্লাস চলছে। অনেক বিদ্যালয়ে নেই সীমানাপ্রাচীর, পর্যাপ্ত বেঞ্চ কিংবা শিশুদের খেলার মাঠ।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ভবনের পরিবর্তে বিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরের চারটি  টিনশেডে গাদাগাদি করে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইমুনা খাতুন ও সরোয়ার হোসেন জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে তাদের সব সময় ভয় লাগে। বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, আর গরমের সময় টিনশেডে অসহনীয় তাপের কারণে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে যায়। পরীক্ষার সময়ও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছেন। শিক্ষাসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প ভবন না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিয়ার রহমান বলেন, বিদ্যালয়টি কয়েকবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ ৫০৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন ১০ থেকে ১২টি শ্রেণিকক্ষ, সেখানে রয়েছে কয়েকটি টিনশেডের কক্ষ। 

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন জানান, স্থানীয়দের সহযোগিতায় এবং উপজেলা পরিষদের সহায়তায় একটি টিনশেড নির্মাণ করে কোনোভাবে পাঠদান চলছে। তিনি বলেন, 'গরমে টিনশেডে থাকা যায় না, আবার বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।'

উপজেলার ফতেকাটি কুশোডাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুর রব বলেন, বিদ্যালয়টির ভবন এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বর্ষা মৌসুমে গোলপাতার ছাউনি চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং অনেকেই স্কুলে আসতে চায় না। তিনি বলেন, 'এ অবস্থায় শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত একটি পাকা ভবন নির্মাণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।'

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, 'উপজেলার জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবনের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে যেসব বিদ্যালয়ে প্রয়োজন, সেখানে অস্থায়ী শেড নির্মাণ করে পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।'

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'উপজেলার জরাজীর্ণ, টিনশেড ও ব্যবহার অনুপযোগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভবনের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ শুরু করা হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।'

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত