দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একদল শিক্ষক নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপনে সংগঠিত হয়ে দেশব্যাপী নৈরাজ্যের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন- এমন অভিযোগ তদন্তে ৫ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে আগামী ১২ আগষ্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছেন ইবি রেজিষ্ট্রার দপ্তর।
বিষয়টিকে ঘিরে ইবি ক্যাম্পাসে অভ্যন্তরীনভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে। ওই তাগাদাপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন শিক্ষকের নাম উঠে এসেছে।
গত বুধবার (৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই, অভিযোগে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় সুপারিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে এই কমিটি কাজ করবে।
ইবি প্রশাসন কর্তৃক গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো.এমতাজ হোসেনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রফেসর ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান (আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ), প্রফেসর ড. মো. রফিকুল ইসলাম (আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ), ড. মো. সাদাত হোসেন (প্যানেল আইনজীবী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট)। কমিটির সচিবিক দায়িত্বে রয়েছেন অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-হিসাব পরিচালক মো. ইসরাফিল হক।
ইবি রেজি: অফিস আদেশে আগামী ১২ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগে জড়িত শিক্ষকদের চিহ্নিত করে করণীয় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বাস্তবতা অনুসন্ধানেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে টেলিগ্রামভিত্তিক একটি গোপন গ্রুপের মাধ্যমে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক সমন্বিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এই গোপন নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামানকে সভাপতি এবং ড. মাহবুবর রহমান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। এই টেলিগ্রাম গ্রুপে নিয়মিত অনলাইন বৈঠক, বার্তা আদান-প্রদান এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ওই টেলিগ্রাম গ্রুপের ২৮ পৃষ্ঠার স্ক্রিনশট থেকে ৪০৩ জন শিক্ষকের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন সদস্য সাংকেতিক নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকের নাম এসেছে-
প্রতিবেদনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- ড. মো. মাহবুবর রহমান, কে এম শরফ উদ্দিন, শারমিন সুলতানা, প্রফেসর ড. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান প্রফেসর ড. সেলিনা নাসরিন, ড. মো. মিজানুর রহমান, নাসিরুল হক, মো. শফিকুল ইসলাম, ড. আজরান আজমী, প্রফেসর ড. মো. মিজানুর রহমান, জয়, ড. তহিদুর রহমান, অঞ্জন কুমার রায়, প্রফেসর মো. সাজ্জাদ হোসেন, আলতাফ রাসেল, মিনহাজুল হক, ড. মো. আসাদুজ্জামান, আফরোজা সাথী এবং প্রফেসর ড. মাহবুব শুভ।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, তালিকায় থাকা আরও কয়েকজন শিক্ষক সাংকেতিক পরিচয় ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
এর বাইরেও সড়কের একজন ভাইস চ্যান্সেলর, দুজন প্রোভাইসচ্যান্সেলর, দুজন ট্রেজারার এবং আরো বেশ কিছু কর্মকর্তা ও শিক্ষকের নাম রয়েছে এই তালিকায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ জন এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন শিক্ষক এই গ্রুপের সাথে যুক্ত।
অভিযোগ প্রসঙ্গে আলাপকালে অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়; বরং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিচ্যুত, বরখাস্ত, বয়কট কিংবা প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার শিক্ষকদের সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তিনি দাবি করেন, সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেই করা হয়েছে এবং এটিকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার সুযোগ নেই।
এবিষয়ে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘পূর্ববর্তী প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান না। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের আদর্শিক অনুসারীরা যদি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’।
প্রশাসনের নজরে তদন্ত :
ইবি প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করেন। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভূমিকা, প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যথাযথ সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবেন। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এই ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।
