দাদা-দাদিকে হত্যার পর স্কুলে কিশোরের গুলিবর্ষণ, নিহত ৭

  • স্কুলের পোশাক পরা এক ছাত্রী যখন শিক্ষকের সাথে কথা বলছিল, ঠিক তখনই চোখের সামনে নেমে আসে আঁধার- গুলি লেগে লুটিয়ে পড়েন শিক্ষক; প্রাণ বাঁচাতে দেওয়াল টপকে পালাতে হয় শিক্ষার্থীদের
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ এএম

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠে দেবসিরিন স্কুলে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর শিক্ষার্থীর এলোপাতাড়ি গুলিতে তার নিজের দাদা-দাদী এবং স্কুলের ৫ জন শিক্ষকসহ মোট ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় আরও ২৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, নিজের দাদা-দাদী এবং ৫ শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যার পর হামলাকারী কিশোর নিজেও আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার সময়ও তার কাছে ৩০টিরও বেশি তাজা গুলি অবশিষ্ট ছিল।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে অন্তত ৯ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চলতি বছরে থাইল্যান্ডের কোনো স্কুলে এটি দ্বিতীয় বন্দুক হামলার ঘটনা, যা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

দেশটির জাতীয় পুলিশ প্রধান জেনারেল কিত্তিরাত ফানপেত সাংবাদিকদের জানান, ফরেনসিক কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ওই কিশোরের বন্দুকের নিশানা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। তার ছোড়া গুলিগুলো ভুক্তভোগীদের শরীরের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিদ্ধ হয়েছে।

ঘটনাটি কীভাবে ঘটল তা নিয়ে বর্ণনা দিতে গিয়ে থাই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই হামলাটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ছিল। হামলাকারী কিশোর স্পষ্ট লক্ষ্য এবং নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে এই নৃশংসতা চালিয়েছে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১০টার কিছু পর (জিএমটি ০৩:০০) যখন সক্রিয় গোলাগুলি শুরু হয়, তখনই ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঘটনার সময় দেবসিরিন স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রী তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জানায়। বিবিসির কাছে সে জানায়, ‘আমি ঠিক আমার শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। উনি আমার সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই ওই ছেলেটি এসে উনাকে গুলি করে। চারপাশ ধোঁয়া আর ধুলায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।’

স্কুল পোশাক পরা ওই শিক্ষার্থী আরও জানায়, আততায়ী কিশোর এক রুম থেকে অন্য রুমে গিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছিল। জীবন বাঁচাতে সে তার বন্ধুদের সাথে স্কুলের উঁচু দেয়াল টপকে বাইরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তার মা কেঁদে উঠে বলেন, ‘মেয়েটি ভাবছিল সে আর কোনোদিন বেঁচে ফিরবে না। আমাকে বলছিল- মা, ভেবেছিলাম তোমার সাথে আর কখনো দেখা হবে না।’

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেক শিক্ষার্থী জানায়, প্রথমে সে বন্দুকের শব্দকে পটকা ফোটানোর শব্দ মনে করেছিল। সে জানায়, ‘হঠাৎ পরপর অনেকগুলো শব্দ হলো- বাং বাং বাং! তারপর কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। একটু পরেই আবার একই শব্দ শুরু হলো।’

ঘটনার পর পর আতঙ্কিত শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের জীবন বাঁচাতে দিকবিদিক ছুটতে দেখা যায়। স্কুলের বাইরে উদ্বিগ্ন ও কান্নাভেজা চোখে স্বজনদের ভিড় জমে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত সাধারণ মানুষকে এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয় এবং ভবনের ভেতরে আটকে পড়াদের নিরাপদে আত্মগোপন করে উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করতে বলে।

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্কুলের পক্ষ থেকে আহতদের জন্য জরুরী রক্তের আবেদন জানানো হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আশেপাশের অন্যান্য স্কুলের ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হামলাকারী কিশোরের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি পুলিশ এবং তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল কারণও এখনো অস্পষ্ট।

পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কিশোরটির বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। ফলে সে তার দাদা-দাদীর সাথেই এক বাড়িতে বসবাস করত। স্কুলে তাণ্ডব চালানোর আগে সে নিজের ঘরেই ভালোবাসায় আগলে রাখা দাদা-দাদীকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ তাদের বাড়ি থেকে কম্পিউটার, ডিজিটাল সরঞ্জাম ও বিভিন্ন নথিপত্র ভর্তি বাক্স জব্দ করেছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কিশোরের বাবা ও মা উভয়কেই স্থানীয় থানায় তলব করা হয়েছে।

যে স্কুলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, সেই দেবসিরিন স্কুলটি ১৮৮৫ সালে ব্যাংককে প্রতিষ্ঠিত হয়। থাইল্যান্ডের অন্যতম শীর্ষ ও স্বনামধন্য এই মাধ্যমিক বিদ্যাপিঠের শাখা দেশজুড়ে বিস্তৃত। কূটনীতিবিদ, অ্যাথলেট থেকে শুরু করে দেশটির বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে থাই প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, ‘এই ট্র্যাজেডি কোনোভাবেই হওয়া উচিত ছিল না। সাধারণ নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি কেন দেওয়া উচিত নয়, এটি তারই প্রমাণ। আমি কেবল ভুক্তভোগীদের জন্যই সমবেদনা জানাচ্ছি না, বরং আমাদের দেশে কীভাবে এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারল, তা ভেবে গভীরভাবে ব্যথিত।’

উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডে আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত আইন বেশ কঠোর। অবৈধ অস্ত্র বহনের দায়ে সেখানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডেই সাধারণ মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে, যার প্রায় ৪০ শতাংশই অবৈধ। অবশ্য এই হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি কিশোরের দাদার বৈধ অস্ত্র ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি।

শুক্রবার রূপ নেওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পুরো থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আগ্নেয়াস্ত্র আইন পর্যালোচনার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র চাপ সৃষ্টি হলে প্রধানমন্ত্রী অনুতিন দ্রুত একটি নতুন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, প্রস্তাবিত নতুন আইনে সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকবে এবং কেবল দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তারাদেরই অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়া হবে।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত