স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালু, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

বাংলাদেশ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল ১০ টায় রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিকিৎসক, ড্যাবের নেতৃবৃন্দ ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, প্রতিদিন চিকিৎসকদের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, প্রশাসনিক জটিলতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এর ফলে উপজেলা থেকে রাজধানীর তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল পর্যন্ত অধিকাংশ চিকিৎসককে স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে ছয় গুণ বেশি রোগীর সেবা দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসকেরা অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করছেন। কোথাও সফলতা আসছে, আবার কোথাও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে জনগণের আস্থার ওপর। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যাচ্ছেন। চিকিৎসা ব্যয় বাবদ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান বহু বছর ধরে চিন্তা করেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘I have a plan—for the country, for the people.’ সেই মহাপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘সুস্থের বাংলাদেশ’।

ড. জিয়াউদ্দিন বলেন, এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যেখানে চিকিৎসক সম্মান নিয়ে কাজ করবেন, রোগী মর্যাদার সঙ্গে সেবা পাবেন এবং অর্থের অভাবে কিংবা মানসম্মত চিকিৎসার অভাবে কোনো মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হবেন না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না মন্তব্য করে তিনি বলেন,এর জন্য প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। এ লক্ষ্যেই স্বাস্থ্য সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনার আওতায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহুরে ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। নিয়োগ দেওয়া হবে এক লাখ নতুন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, ২৫ হাজার নতুন মিডওয়াইফ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। লক্ষ্য হবে রোগ হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা এবং মানুষের ঘরের কাছেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।

একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ধাপে ধাপে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মা ও শিশুদের অধিকাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিজ উপজেলাতেই নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। জেলা হাসপাতালগুলোকে বিশেষায়িত সেবায় আরও সক্ষম করা হবে, যাতে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিটি রোগীকে ঢাকায় ছুটে আসতে না হয়।

পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক মানের উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।

অনুষ্ঠানে সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রতিটি নাগরিককে একটি হেলথ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, ইলেকট্রনিক রোগী ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক রেফারেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর ফলে রোগীর অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমবে, হাসপাতালে অতিরিক্ত চাপ হ্রাস পাবে এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ও মান উন্নত হবে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া স্থানীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে প্রতিটি জেলায় আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে দেশে কার্যকর প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, তিনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তার অনেকগুলোর বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং চিকিৎসকদের অনেকেই এই পরিবর্তনের অংশীদার। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। একটি ঐক্যবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ চিকিৎসক সমাজই স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি অতীতের বিভেদ ও অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন অধ্যায় শুরুর আহ্বান জানান। এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে চিকিৎসক হবেন সম্মানিত, রোগী হবেন নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে আধুনিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত