রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৬ বছরে নিহত ১৫ হাজার

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

গত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ১৪৩ জন। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রতিবেদন’-এ এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরভিত্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে তা বেড়েছে। ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন। ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩ হাজার ৯১ জন।

২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হন। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভারী যানবাহনের ধাক্কায় বেশি দুর্ঘটনা
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা হয়েছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে ভারী যানবাহনের সংঘর্ষে। এ ধরনের দুর্ঘটনা ৬ হাজার ৩১৪টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এ ছাড়া মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৮টি, যা মোট দুর্ঘটনার ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পণ্যবাহী যান। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্র্যাক্টর, ট্রলি ও লরির কারণে ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

মোটরসাইকেল চালকের এককভাবে দায়ী হওয়ার ঘটনা ৫ হাজার ৮৩১টি বা ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাসের কারণে ২ হাজার ১৬৪টি, থ্রি-হুইলারের কারণে ৭৩২টি এবং প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ৪৩৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আঞ্চলিক সড়কে বেশি
সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি, শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেলের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণেরা চালান। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

বেপরোয়া চালানো নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোর-তরুণদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে উৎসাহিত করছে। এতে মোটরসাইকেল চালকের পাশাপাশি পথচারী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীরাও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

এ ছাড়া বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনার কারণেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গণপরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, যানজট এবং সহজ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতব্যবস্থার অভাবেও মানুষ মোটরসাইকেলের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

আরও যেসব কারণ চিহ্নিত
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে কিশোর-তরুণদের বেপরোয়া চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচির ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি এবং অসহনীয় যানজটকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সুপারিশ
পরিস্থিতি উন্নয়নে মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণা জোরদার, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত