রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার অভিযোগে ভারত ও চীনসহ অন্তত ৫টি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পথ সুগম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। সেই সঙ্গে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাবও করা হয়েছে বিলে। বিলটি উত্থাপনের পর সিনেটের ১০০ জন সদস্যের মধ্যে ৮৬ জন সেটির পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে পড়ে ১১টি ভোট। ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন বাকি ৩ জন। বিলে রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি পণ্যের বৃহৎ ক্রেতাদের ওপর শুল্ক আরোপের পাশাপাশি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, রাশিয়ার ধনকুবের এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সিনেটে পাসের পর বিলটি এখন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পাঠানো হবে। আগামী ৩১ আগস্ট সেখানে পাস হলে বিলটি যাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দপ্তর ওভাল অফিসে। ট্রাম্পের সইয়ের পর আইনে পরিণত হবে বিলটি। ভারত ও চীন ছাড়াও এই তালিকার অন্য তিন দেশ আজারবাইজান, হাঙ্গেরি এবং সেøাভাকিয়া।
এই আইনে পুতিন, রাশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা, রাশিয়ান আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রাশিয়ান জ্বালানি প্রকল্পের ওপরও নিষেধাজ্ঞার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি রাজস্বের ওপর আরোপিত বর্তমান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মস্কো যে পুরনো এবং ফ্ল্যাগ পরিবর্তন করা তেল ট্যাংকারগুলো ব্যবহার করে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও বাড়াবে। তবে এই বিলে এই দেশগুলোর জন্য একটি ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৫ শতাংশেরও কম রাশিয়া থেকে আমদানি করা এবং সেই আমদানি আরও কমিয়ে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। গত ১১ জুলাই মারা যাওয়া ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সমর্থক ও রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্র্যাহামের স্মরণে এই বিলটির নামকরণ করা হয়েছে। পঞ্চম বছরে পদার্পণ করা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ছিলেন গ্র্যাহাম।
সিনেটে গ্রাহামের স্থলাভিষিক্ত হওয়া বোন ডারলিন গ্র্যাহাম জানান, এই বিলটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত হেনেছে। তিনি জানান, এই বিল রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রধান দেশগুলোকে একটি সহজ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্যবসা করা নাকি সস্তা রাশিয়ার জ্বালানি কেনা। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল, যিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্র্যাহামের সঙ্গে এই বিলটি পাসের জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন, তিনি বলেন, ইউক্রেনের মানুষ একা নন। ভোটের পর সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেন থেকে নজর রাখছেন এবং পুতিন মস্কো থেকে দেখছেন। আমি ভাবতে চাই লিন্ডসে গ্র্যাহামও হয়তো ওপর থেকে দেখছেন। এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক সেই সব পক্ষকে থামিয়ে দেবে, যারা সাহসী স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরুদ্ধে এই হত্যাযজ্ঞ ও অপরাধমূলক আগ্রাসনের যুদ্ধে জড়িত।’ যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এ ধরনের বাণিজ্য ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থ জোগাতে সহায়তা করছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বিলটিতে ১৯৯৬ সালের ইরান নিষেধাজ্ঞা আইনের মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই আইনের আওতায় ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোকে শাস্তি দেওয়া হয়। তবে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য সতর্ক করে বলেছেন, এই বিল ট্রাম্পকে নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেবে। এমন সময়ে তাকে এই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, যখন তিনি শুল্ককে তার বাণিজ্যনীতির মূল হাতিয়ার বানিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য গ্রেগরি মিকস ও ডন বেয়ার এই আইনের সমালোচনা করেছেন। তাদের ভাষায় এটি ব্যাপক নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তৈরি করবে, যা প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, যেমনটি তিনি অতীতে বারবার করেছেন। তারা বলেন, আমরা ইউক্রেনকে সমর্থন করতে এবং রাশিয়াকে তার অব্যাহত অবৈধ যুদ্ধের জন্য শাস্তি দিতে আমাদের সিনেট সহকর্মীদের জরুরি প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই; কিন্তু এই বিল সেই লক্ষ্যগুলো অর্জন করবে না। বরং এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাশিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনা এড়িয়ে যাওয়ার এবং তার ধ্বংসাত্মক বাণিজ্যযুদ্ধে আরও শুল্ক আরোপের সুযোগ দেবে, যার ব্যয় শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের বহন করতে হবে।
