একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যখন অভিযোগের চেয়ে পাল্টা অভিযোগ বেশি আলোচনায় আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং সমঝোতার আড়ালে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে-তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আসলে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নলতা আহছানিয়া মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজটিতে কী চলছে?
বিষয়টি বাইরে থেকে দেখলে একজন অধ্যক্ষকে ঘিরে কিছু অভিযোগ, বিরোধিতা ও প্রশাসনিক জটিলতা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গভীর বলেই প্রতীয়মান হয়। অভিযোগ রয়েছে, এখানে প্রশাসনিক বিষয়কে ছাপিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পক্ষ-বিপক্ষের হিসাব-নিকাশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ-এমনটাই দাবি করছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ।
যতটুকু জানা গেছে, পরিস্থিতির সমাধানের জন্য অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ এক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা বা সমঝোতার পথে এগোলে অন্য পক্ষ তাতে আপত্তি তুলছে। আবার বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নিলে হিংসাত্মকভাবে রাগান্বিত হয়ে নতুন করে আরেক পক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়ে উঠছে।
ফলে সংকট সমাধানের পরিবর্তে প্রতিটি উদ্যোগই যেন নতুন সংকট তৈরি করছে।
আর এখানেই উঠছে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ-দুই পক্ষকে সামাল দিতে গিয়ে অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, এক পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করলে অন্য পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুকে সরব হচ্ছে; আবার অন্য পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা হলে প্রথম পক্ষ পাল্টা অবস্থান নিচ্ছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা নিছক ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবেশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে আলোচনায় আসা বিষয়গুলোর মধ্যে আর্থিক বিষয়, নিয়োগ বানিজ্য এবং সাবেক এমপি ডা. রুহুল হকের আত্মীয়তার সম্পর্কটিও সামনে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন করা দরকার-কেউ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সাবেক জনপ্রতিনিধির আত্মীয় হলেই কি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বেড়ে যায়? অবশ্যই নয়।
অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে। প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা হবে। কিন্তু আত্মীয়তার পরিচয় নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত তার নিজের কাজ, সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে। তিনি কার আত্মীয়-সেটি দিয়ে তার দায় নির্ধারণ করা হলে ন্যায়বিচারের মূল ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি ফেসবুকের পোস্ট, মন্তব্য, পাল্টা পোস্ট কিংবা অনলাইন চাপের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা কোথায় থাকে?
এখন যেন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এক পক্ষ অভিযোগ করছে। অন্য পক্ষ তার প্রতিবাদ করছে। কেউ সমর্থনে পোস্ট দিচ্ছে, কেউ বিরোধিতায়। আবার কোনো পক্ষের অভিযোগের উচ্চকণ্ঠ সমালোচনা থামাতে সমঝোতার চেষ্টা করা হলে অন্য পক্ষ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন ওঠে-এটি কি সত্য উদঘাটনের প্রক্রিয়া, নাকি নিজেদের অবস্থান শক্ত করার প্রতিযোগিতা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ তোলা সহজ। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এই টানাপোড়েনে অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কি না, সেটি সময়ই বলবে। কিন্তু একটি বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম-ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নলতার ঐতিহ্যবাহী কলেজটির ভাবমূর্তি।
একটি কলেজের পরিচয় কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল কিংবা সাময়িক ক্ষমতার সমীকরণ দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা পরিবেশ, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম।
নলতার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি যদি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলে এই কলেজের কিছু শিক্ষকের জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনারা অনুগ্রহ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই খেলা থেকে সরে এসে নিজেদের কলেজের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হোন। আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে প্রিয় কলেজটিকে সংকট থেকে রক্ষা করে তার সুনাম ও ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে।
আজ একজন অধ্যক্ষকে কেন্দ্র করে বিরোধ। আগামীকাল অন্য কোনো শিক্ষক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ঘিরে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তার প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র হারিয়ে ফেলবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষতা। কারও পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়, আবার কারও বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও নয়।
অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে যেসকল অভিযোগ উঠেছে সেগুলো সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ/দপ্তর নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত-উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে। আগে প্রমাণ যাচাই করা হোক। তদন্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
একইভাবে অর্থের বিনিময়ে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।
কারণ গুজব ও অভিযোগের মধ্যবর্তী জায়গায় কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকতে পারে না।
ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই সবার আগে। তোফায়েল আহমেদ নির্দোষ কি না, কিংবা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে কি না-সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়।
কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন-কোনো ব্যক্তি, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো পক্ষের স্বার্থ যেন নলতার ঐতিহ্যবাহী কলেজটির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে না ওঠে।
কারও আত্মীয় হওয়া অপরাধ নয়। আবার কোনো পদে থাকা ব্যক্তিও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন। তাই পথ একটাই-অভিযোগ থাকলে তদন্ত, প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ।
কারণ রাজনৈতিক পক্ষ বদলাবে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলাবে, আজকের অভিযোগকারী কাল অন্য অবস্থানে যেতে পারেন। কিন্তু একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি নলতার মানুষের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী কলেজটিকে নিয়ে।
নলতার কলেজ কি থাকবে শিক্ষার আলো ছড়ানোর জায়গা হিসেবে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং অর্থের অভিযোগের ঘূর্ণিতে তার ঐতিহ্য হারাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু প্রশাসনের নয়-নলতার মানুষেরও জানা প্রয়োজন।
কারণ একজন মানুষ বলির পাঁঠা হলে ক্ষতি একজনের। কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলির পাঁঠা হলে ক্ষতি হয় একটি প্রজন্মের।
লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী
