বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী গোষ্ঠী নেই’ এবং এ দেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ ‘অপ্রাসঙ্গিক’—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এমন সাম্প্রতিক যৌথ বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।
‘বিতর্কিত’ এ বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতিগত সত্তাকে সরাসরি অস্বীকার করার শামিল।
বুধবার (১২ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিচিত্রা তির্কি ও সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান এই যৌথ প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে যেকোনো ধরনের অপরাজনীতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি ও ধর্মের এক বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। বাঙালি ও আদিবাসী উভয়েই এ দেশের সমান মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক ও বাংলাদেশি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সবাইকে ঢালাওভাবে একই পরিচয়ে চিহ্নিত করার চক্রান্ত আদিবাসীদের মৌলিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, ‘সকলে বাংলাদেশের অধিবাসী হলেও বাঙালিরা আদিবাসী নন এবং আদিবাসীরাও বাঙালি নন। আদিবাসী পরিচয় বহু কাল আগে থেকেই এ দেশের প্রান্তিক ও প্রাচীন জাতিসত্তার মানুষরা গৌরব ও অধিকারের সাথে ধারণ করে আসছে।’
আদিবাসী পরিষদ স্মরণ করিয়ে দেয়, শুধু উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, রংপুর এবং সিলেট ও খুলনা বিভাগেই সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাওঁ, বেদিয়া, কুর্মি, পাহাড়িয়া, মাহালী, মুসহর, কোল ও কোচের মতো প্রায় ৩৮টিরও বেশি ভিন্ন জাতিসত্তার ৩০ লাখেরও বেশি আদিবাসী মানুষ যুগের পর যুগ বসবাস করছেন।
লোকমুখে ও সামাজিকভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৪৪ সালে নওগাঁর বদলগাছীতে প্রতিষ্ঠিত ‘পাহাড়পুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়’সহ কেবল উত্তরবঙ্গেই ৬৫টির বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ‘আদিবাসী’ শব্দটি যুক্ত রয়েছে, যা তাদের প্রথাগত অবদানেরই বাস্তব প্রমাণ।
সাংবিধানিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রসঙ্গ টেনে বিজ্ঞপ্তিতে ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বাণী উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন—‘আমাদের জনগোষ্ঠীরই একটি অংশ আদিবাসী।’
এছাড়া রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন (১৯৫০)-এর ৯৭ ধারায় আদিবাসীদের জমি সুরক্ষার জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ আদিবাসীদের স্বকীয় ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশের অঙ্গীকার স্পষ্ট।
এর আগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, সবাই এক ও অভিন্ন ‘বাংলাদেশি অধিবাসী’।
একই অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন। দুই মন্ত্রীর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে আদিবাসী পরিষদ অবিলম্বে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ 'আদিবাসী' না
সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস