২০২৫ সালে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সামরিক হামলায় ১৫৩ জন সাধারণ (বেসামরিক) নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এসব হামলায় আরও ২৪৩ জন আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে এই তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) মার্কিন এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে মার্কিন বাহিনীর হামলায় বেসামরিক মানুষের যত প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটেছে, তার সবই হয়েছে মে মাসে ইয়েমেনে চালানো মাত্র তিনটি পৃথক হামলার মাধ্যমে।
বেসামরিক প্রাণহানি সংক্রান্ত পেন্টাগনের বার্ষিক প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে এই নথিপত্র মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে। এনবিসি নিউজ প্রথম খবরটি প্রকাশের পর বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) প্রতিবেদনটির একটি অনুলিপি হাতে পায়। তবে প্রতিবেদনটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে বলে পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানটি ২০২৪ সালের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কারণ ২০২৪ সালে মার্কিন হামলায় মাত্র দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং দুজন আহত হয়েছিলেন বলে পেন্টাগন জানিয়েছিল।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিনটি হামলা চালানো হয়েছিল হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা এবং রাস ইসা জ্বালানি বন্দরে।
এর মধ্যে রাস ইসা বন্দরে চালানো হামলাটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। কেবল এই একটি হামলাতেই ৮০ জন প্রাণ হারান এবং ১৭১ জন আহত হন। হামলার সময় বিশাল আগুনের গোলা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বন্দরে থাকা জ্বালানি ট্যাংকারগুলোতে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। পরে হুথিদের আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, স্থানটিতে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারকি করা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) সে সময় বলেছিল, হুথিদের জ্বালানি ও আয়ের উৎস বন্ধ করতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
তখন সেনটকম থেকে বলা হয়, ‘ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ক্ষতি করা এই হামলার লক্ষ্য ছিল না। ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে গত ১০ বছর ধরে হুথিরা যে সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে, তাদের সেই অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা, স্যাটেলাইট ছবি ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পেন্টাগন অবশেষে নিশ্চিত হয়েছে যে, এই তিনটি হামলায় বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
পেন্টাগনের পর্যালোচনায় নিহতের ঘটনায় তাদের পরিবার বা আহতদের কোনো ‘সহানুভূতি তহবিল’ বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করা হয়নি। তবে কেন এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
যদিও মার্কিন আইনে এই ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া বাধ্যবাধকতামূলক নয় এবং এটি কোনো অপরাধ স্বীকারের বিষয়ও নয়, তবুও অতীতে মার্কিন হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। যেমন—২০২১ সালে আফগানিস্তানে ড্রোন হামলায় ৭ শিশুসহ ১০ জন নিহত হওয়ার পর পেন্টাগন স্বজনদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ইয়েমেনে মার্কিন অভিযানে মোট প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ১৫টি হামলার ঘটনা পর্যালোচনা করছে সেনটকম।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক অভিযানে বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৬৮ জন নিহত হন। এ ছাড়া অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মতে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের সেই দপ্তরটির আকার ছোট করে ফেলেছেন, যা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কাজে নিয়োজিত ছিল।
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো শুরু করার পর, ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে ইয়েমেনে প্রথম হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। হুথিদের দাবি ছিল, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে চাপ সৃষ্টি ও ফিলিস্তিনিদের সমর্থন জানাতেই তারা এই হামলা চালাচ্ছে।
তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন অভিযান আরও তীব্র করা হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, হুথিদের সামরিক ক্ষমতা ধ্বংস করা এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখাই তাদের লক্ষ্য।
পেন্টাগনের এই মূল্যায়নে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য বিতর্কিত অভিযানের প্রাণহানি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যেমন—ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন নৌকায় হামলা চালাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় এ পর্যন্ত ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এদের ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ (মাদক সন্ত্রাসী) হিসেবে আখ্যা দিলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলাগুলোকে ‘বেআইনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নও ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবিগুলোকে ‘প্রমাণহীন’ বলে বাতিল করে দিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
ইরান-হুতি-হিজবুল্লাহর হামলায় দিশেহারা ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের হামলায় ৫ হুতি নিহত, বেড়েছে তেলের দাম