জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে মিলল ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ!

জঙ্গলের ভেতর চাপা পড়ে থাকা যে মসজিদকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে অলৌকিকভাবে এক রাতে তৈরির গল্প

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ যেন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। তিনটি বড় গম্বুজ, পুরু দেয়াল, নকশাখচিত দরজা ও মেহরাবের পুরোনো কারুকাজে এখনো মুঘল স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত।

গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের বৃ-চাপিলা গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। সময়ের সঙ্গে মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়েছে এবং যুক্ত হয়েছে আধুনিক বিভিন্ন সুবিধা। তবে পুরোনো স্থাপনার নকশা ও কারুকাজ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। মূল অংশে প্রবেশ করলে কয়েক শ বছর আগের সময়ের স্মৃতি যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

স্থানীয় ইতিহাস ও উপজেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, মুঘল আমলে বর্তমান চাপিলা অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে তাঁর ছেলে শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকার সময় এখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়ি ছিল বলে জানা যায়। সেনাসদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় মুসলমানদের নামাজের সুবিধার জন্যই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে।

মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুনশি এনায়েতউল্লাহর নাম পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে তাঁকে মুঘল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

একসময় চাপিলা এলাকার গুরুত্ব কমে যায়। মুঘল সেনা ও অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর জনবসতিও ধীরে ধীরে কমে যায়। পরে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ঢেকে যায় মসজিদটি। দীর্ঘ সময় মানুষের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে ছিল প্রাচীন এই স্থাপনা।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে সেখানে নতুন করে বসতি গড়তে শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, জঙ্গল পরিষ্কারের সময় তাঁরা বহুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মসজিদটির সন্ধান পান। এরপর স্থানীয় উদ্যোগে সেটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয় এবং আবার সেখানে নামাজ আদায় শুরু হয়।

জঙ্গলের ভেতর হঠাৎ মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নানা লোককথা তৈরি হয়। একপর্যায়ে অনেকের মধ্যে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, মসজিদটি অলৌকিকভাবে এক রাতেই তৈরি হয়েছিল। এভাবেই মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় ‘গায়েবি মসজিদ’। তবে মসজিদের স্থাপত্য ও ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীর দিকেই ইঙ্গিত করে।

ইট ও সুড়কি দিয়ে তৈরি মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট। দেয়াল প্রায় চার ফুট পুরু। পুরোনো স্থাপনায় রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ ও দুই পাশে দুটি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের চূড়ায় রয়েছে চাঁদ-তারার প্রতীক। সংস্কারের পর গম্বুজে সোনালি রঙ করা হয়েছে, ফলে দূর থেকেই মসজিদটি নজর কাড়ে।

মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে নকশা ও কারুকাজ করা তিনটি দরজা। ভেতরের দেয়াল ও মেহরাবেও পুরোনো অলংকরণের চিহ্ন রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়ের ক্ষয় এবং বিভিন্ন সংস্কারকাজের কারণে প্রাচীন কারুকাজের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, একসময় পুরো এলাকা বড় বড় বেতঝোপ ও জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। পুরোনো প্রজন্মের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, সেই জঙ্গলের মধ্যেই মসজিদটি চাপা পড়ে ছিল।

এলাকার প্রবীণদের স্মৃতিতেও মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প। তাঁদের ভাষ্য, একসময় আশপাশের পরিবেশ এতটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে বন্য প্রাণীর আতঙ্ক ছিল নিয়মিত। মুসল্লিদের কেউ কেউ পালা করে পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতেন।

মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জানান, পুরোনো মসজিদে তিন কাতারে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। পরে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৯০ সালের পর মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে অর্ধশতাধিক মানুষ নামাজ পড়েন। আর জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিও রয়েছে। পুরোনো রেকর্ডে মুনশি এনায়েতউল্লাহর পক্ষ থেকে মসজিদের জন্য জমি দানের তথ্য পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ এখন শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রতিদিন স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পুরোনো এই স্থাপত্য দেখতে আসেন। কারও কাছে এটি ধর্মীয় আবেগের জায়গা, আবার কারও কাছে ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।

৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে রোদ-বৃষ্টি, ঝড় ও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি আজও যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদ ও মুঘল আমলের ইতিহাসের কথা বলে চলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুরোনো স্থাপত্যের স্মৃতি ধরে রাখা বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ তাই গুরুদাসপুরের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত