৮ মাসে পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১,২৮৫

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছেই না। আট মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ২৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ২১৭ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ২৩, নাজিরপুরে ছয়, নেছারাবাদে ১৪, কাউখালীতে আট, ভান্ডারিয়ায় ১১ ও মঠবাড়িয়ায় ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উপজেলা জিয়ানগর ইউনিয়নে কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি ৫৯৭ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এ ছাড়া নাজিরপুরে ৭৮, নেছারাবাদে ২১৬, কাউখালীতে ৯৬, ভান্ডারিয়ায় ২৪২ ও মঠবাড়িয়ায় ৫৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

এদিকে, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে সাধারণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে সীমিত সিটের কারণে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তাছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কক্ষের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর বাবা মো. হাসান খান বলেন, তার মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসাসেবা ভালো পেলেও হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো।

পেটে ব্যথা নিয়ে ভর্তি তহমিনা খানম বলেন, একই জায়গায় ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীরা থাকায় তিনি উদ্বিগ্ন।  রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা করেচেন তিনি। তার মতে, ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের জন্য পৃথক কক্ষ থাকা  জরুরি।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সদর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক রোগী মশারি ব্যবহার করছেন না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নার্সদের নির্দেশনায় কয়েকজন রোগী মশারি টানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক নার্স জানান, রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে তা খুলে রাখেন।

আব্দুস সালাম নামে এক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, সাংবাদিকরা আসার পর অনেক রোগী মশারি টানিয়েছেন। ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

পিরোজপুর সদর হাসপাতাল জানায়, প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর চাপও রয়েছে। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল কনসালট্যান্ট সুরঞ্জিত সাহা বলেন, এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমছে না। একজন রোগীর চিকিৎসায় পাঁচ থেকে ছয়দিন সময় লাগে। এর মধ্যে নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চাপ বাড়ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

পিরোজপুর পৌরসভার ৫নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাখাওয়াত শেখ জানান, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তার পাশে পানি জমে থাকা এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে।

পৌরসভার বাসিন্দা রতন সিকদার বলেন, বিভিন্ন স্থানে ময়লা ও পানি জমে থাকে। ফুলের টব,গর্তসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি।

পিরোজপুর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বনি আমিন বলেন, মশার লার্ভা নিধনে নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে। বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করার কাজও চলছে।

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। স্কুল ও কলেজেও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. মতিউর রহমান জানান, ডেঙ্গুর পরিস্থিতি পর্যালোচনায়  রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি তদন্ত দল পিরোজপুরে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে সুপারি ও নারিকেল গাছের গোড়া ও নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর উৎস পাওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি। জনগণের সচেতনতার ঘাটতিকেও তারা একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সিভিল সার্জন বলেন, তদন্ত শেষ হলে দলের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত