সিন্ডিকেটের থাবায় বছরে পান রপ্তানি কমেছে ৩৪ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি 

 ‘সাম্প্রতিক সময়ে  “বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি” নামধারী একটি চক্রের স্বেচ্ছাচারিতা ও চাঁদাবাজির কারণে এই খাতটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।’

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

পান রপ্তানিকারক সমিতির নেতা অথচ নেই কোনো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। কোনোদিন পান রপ্তানি করেননি তারা। বরং যারা নিয়মিত পান রপ্তানি করেন তাদেরকে পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আজকে এক নিয়ম তো কালকে আরেক নিয়ম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো, এফ বি সি সি আই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পান রপ্তানির পক্ষে পদক্ষেপ নিলে সমিতির নেতারা চলে যান আদালতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের আদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নেন তারা। এরপর আবার বাধার সৃষ্টি করেন। এভাবে সমিতির অবৈধ বাধার কারণে গত এক বছর পান রপ্তানি কমেছে ৩৪ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে পান রপ্তানী খাতে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধে এবং অবাধ পান রপ্তানীকরণ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবরে চিঠি পাঠিয়েছে কৃষি পণ্য আমদানীকারক সমিতি, সৌদি আরব শাখা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরিত একটি চিঠি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। 

চিঠিতে যা রয়েছে : ‘কৃষি পণ্য আমদানীকারক সমিতি, সৌদি আরব গত ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বানিজ্য মন্ত্রনালয়, কৃষি মন্ত্রনালয়, অর্থ মন্ত্রনালয়, জাতীয় রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো ও কনস্যুলেট জেনারেল বাংলাদেশ, জেদ্দা, সৌদি আরব বরাবরে পান রপ্তানী খাতে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধে এবং অবাধ পান রপ্তানীকরণ নিশ্চিত করণ লক্ষ্যে ১ টি চিঠি প্রেরণ করে। এতে পান রপ্তানিখাতের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধ এবং অবাধ পান রপ্তানি কার্যক্রম নিশ্চিতকরার দাবি জানানো হয়।’

চিঠিতে বলা হয়, ‘আপনার সদয় অবগিতর জন্য শিরোনামে বর্ণিত বিষয়ে জানানো যাচ্ছে যে, আমরা সৌদি আরবে পান আমদানী কারকবৃন্দ দীর্ঘ স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত পান আমদানি করে আসছি। বর্তমানে আমরা কিছুদিন ধরে পান আমদানিতে ‘পান রপ্তানি কারক সমিতি'র বাঁধার সম্মুখিন হচ্ছি। যার কারণে আমাদের দীর্ঘদিনের তৈরী করা মার্কেট ধ্বংস করার জন্য কতিপয় অসাদু চাঁদাবাজ চক্র উঠে পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের পানের গুণগত মানের কারণে বিশ্ববাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’

‘কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানাচ্ছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে 'বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ নামধারী একটি চক্রের স্বেচ্ছাচারিতা ও চাঁদাবাজির কারণে এই খাতটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। উক্ত চক্রটি প্রতিটি পানের বাস্কেটের বিপরীতে ৫০০ টাকা হারে চাঁদা দাবি করছে, যা প্রদান করা রপ্তানিকারকদের জন্য অসম্ভব। এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তারা সাধারণ রপ্তানিকারকদের ওপর নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আমাদের রপ্তানি কারকবৃন্দ এই সব অন্যায় ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অবহিত করেছিলেন। বর্তমানে এই সব অসাধু চাঁদাবাজদের কারণে আমরা আমাদানীকারকগণ ইন্ডিয়ার থেকে পান আমাদানি করতে বাধ্য হবো। যার ফলে আমাদের দেশে হারাবে বৈদিশিক মুদ্রা ও আমাদের কৃষক ভাইরা হারাবে তাদের ন্যায্য পাওনা।’

‘প্রতি শিপমেন্টে সংশ্লিষ্ট সমিতির সদস্যের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া পানের বিল অব এক্সপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে না মর্মে উল্লেখ থাকায় রপ্তানিকারকরা এর সুফল ভোগ করতে পারছেন না। এর ফলে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে পান রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২১.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের আয় ৩২.৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় ৩৪.২১% কম। এই পরিস্থিতির কারণে বৈধ রপ্তানিকারকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং পান রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রান্তিক কৃষকরা তাদের পানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

‘এমতাবস্থায়, জাতীয় স্বার্থে ও রপ্তানি খাতকে সচল রাখার লক্ষ্যে বর্ণিত সুপারিশ অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জারিকৃত উক্ত বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে পানের রপ্তানির ক্ষেত্রে সমিতির সদস্যপদের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।’

‘অতএব, আকুল আবেদন, বর্ণিত পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক অসাধু চক্রের সৃষ্ট এই প্রতিবন্ধকতা নিরসনকল্পে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমাদের পান রপ্তানির পথ সুগম করার নির্দেশ প্রদানে আপনার সদয় মর্জি হয়।’

এদিকে সাধারণ পান রপ্তানিকারক সমিতির একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানীকারক সমিতি প্রতিষ্ঠা ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০০২। পরের বছর ২০০৩ সালের ৬ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, পান সমিতির সদস্য ছাড়া পান রপ্তানী করা যাবে না।’

‘একই বছরের ১৮ জুনে আরেক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ পান রপ্তানীকারক সমিতির সনদপত্র ছাড়া পান রপ্তানী করা যাবে না। এই প্রজ্ঞাপনের পর সাধারণ পান রপ্তানীকারকদের পান রপ্তানী বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সাধারণ রপ্তানীকারকরা বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের অফিস আদেশ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট দায়ের করলে আদালত সাধারণ রপ্তানীকারকের পক্ষে রিট মঞ্জুর। আদালতের রায়ের পর সাধারণ রপ্তানীকারকদের রপ্তানী কার্যক্রম আবার শুরু।’

‘দীর্ঘদিন আদালত দুইপক্ষের শুনানী শেষে ১৩ মার্চ ২০০৮ তারিখে বিচারপতি এ, বি, এম খায়রুল হক ও এ,টি, এম ফজলে কবির পান রপ্তানীকারক সমিতির লাইসেন্স বাতিল করে।’ 

‘এরপর ২০১৪ সালে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে বাংলাদেশ পান রপ্তনীকার সমিতি আরেকটি লাইসেন্স নেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে আবারও সাধারণ রপ্তানীকারকবৃন্দ আদালতে রিট দায়ের করেন। দুই পক্ষের দীর্ঘ শুনানীর পর ২০২৫ পান রপ্তানীকারক সমিতি লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়।’

‘২৮ জানুয়ারী ২০২৫ মোসাঃ শুকরিয়া পারভীন উপ-সচিব বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ মে’ ২০০৩ সালের অফিস আদেশটির কার্যকারিতা বহাল রয়েছে মর্মে অবহিত করেন। কাষ্টমস্ হাউজ কুর্মিটোলা ঢাকা ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে পান রপ্তানীকারক সমিতির সনদ পত্র ব্যাতীত পান রপ্তানীর বিল অব এক্সপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে না মর্মে প্রজ্ঞাপন জারী করে। এতে করে আবারও সাধারণ রপ্তানীকারকদের পান রপ্তানী বন্ধ হয়ে যায়।’

‘এরপর শুরু হয় পান রপ্তানিকারক সমিতির অনিয়ম ও অত্যাচার। তারা সাধারণ রপ্তানীকারকদের পান রপ্তানীকারক সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাক চাঁদা দিয়ে পান সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য একটি অফিস আদেশ জারী করে। সাধারণ রপ্তানীকারকগন পান সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকা তাদের চট্টগামন্থ জনতা ব্যাংক কাজীর দেউরি শাখায় জমা করেন এবং কোন রপ্তানীকারককে টাকার গ্রহণের মানি রিসিট প্রদান করেন নাই এবং যাহাদেরকে সদস্য করেছেন, তাদেরকে বাংলাদেশ পান রপ্তানীকারক সমিতির সদস্যপদের সনদ পত্র চাওয়ার পরও প্রদান করেন নাই।  সাধারণ রপ্তানীকারকদের জন্য প্রতি কনসাইনমেন্টের বিপরীতে বাংলাদেশ পান রপ্তানীকারক সমিতি ১,০০০/-(এক হাজার) টাকার বিনিময়ে একটি প্রত্যয়ন পত্র সিস্টেম চালু করেন। প্রত্যয়ন পত্রের মাধ্যমে রপ্তানীকারকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেন। ১৭ কেজি বাস্কেটে ৭৫০/-টাকা ও ১০ কেজি বাস্কেটে ৫০০/- টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে রপ্তানীকারকের নামে প্রত্যয়ন পত্র ইস্যু করে না। চাঁদা দিলে প্রত্যয়ন পত্র ইস্যু করেন।’

‘শুধু তাই নয়, সমিতি নতুন কোন রপ্তানীকারককে সমিতির সদস্য হওয়ার আবেদনের ফরম দেয় না। পুরাতন সদস্যদের নবায়ন করে না। পান রপ্তানীকারক সমিতির কোন এ জি এম হয় না। পান রপ্তানীকারক সমিতির কোন উ.ই.ঈ অডিট ফার্ম দ্বারা অডিট হয় না। পান রপ্তানীকারক সমিতি জ.ঔ.অ.ঈ তে কোন রিটার্ন জমা দেয়া হয় না। পান রপ্তানীকারক সমিতির কোন ওয়েব সাইট নাই যদিও বাণিজ্য সংগঠন আইনে ওয়েব সাইট বাধতামূলক। পান রপ্তানীকারক সমিতির সভাপতি-সেক্রেটারী ২০০৩ সাল থেকে একই ব্যক্তি। পান রপ্তানীকারক সমিতির সভাপতি-সেক্রেটারীর কোন রপ্তানী নাই। অথচ এটি একটি রপ্তানীকারক সংগঠন, তারা সমিতির মেম্বার হওয়ার ও উপযুক্ত নয়, তারা কিভাবে সমিতির সভাপতি-সেক্রেটারী হয়? বাণিজ্য সংগঠনের নিয়ম অনুসারে প্রতি ২ বছর পর পর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলে ও ২০১৪-২০১৫ সালে ঘরোয়া ভাবে একটা নির্বাচন দেখানো হয়। তাহাতে মন্ত্রণালয়ে ১৫ সদস্যের একটা তালিকা দেওয়া হয় কিন্তু সভাপতি-সেক্রেটারী ও অন্যান্য পদের কোন তালিকা দেওয়া হয়নি।’

‘পান ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সাধারণ রপ্তানীকারকগন সমিতির প্রত্যয়ন পত্রের মাধ্যমে শোষণের স্বীকার হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানীকারকগন চাঁদা দিতে দিতে দিশেহারা হয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো, এফ বি সি সি আই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কমিশনার কাষ্টম্স কুর্মিটোলা কে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেন এবং এর প্রতিকারের জন্য আবেদন করেন। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো সাধারণ রপ্তানীকারকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব-বিষয় বিচার বিশ্লেষন করে রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী, সচিব মহোদয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কে প্রতি কনসাইনমেন্ট এর বিপরীতে বাংলাদেশ পান রপ্তানীকারক সমিতির প্রত্যয়ন পত্র ব্যতিত পান রপ্তানীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ জানান।’

পদে পদে চাঁদা : চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর আবেদনের প্রেক্ষিতে পান রপ্তানী বাণিজ্য সহজীকরণ, রপ্তানী প্রক্রিয়ায় বাধাদুরীকরণ ও নির্বিঘ্নে পান রপ্তানী উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বানিজ্য মন্ত্রণালয়ে গত ৬ মে অফিস আদেশটি বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। পান রপ্তানীকারক সমিতি ৭ মে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের অফিস আদেশের বিরুদ্ধে রিট দায়ের করেন। আবার সাধারণ পান রপ্তানীকারকদের পান রপ্তানীতে বাধা দেয়া শুরু করেন। কাষ্টম্স হাউজ কুর্মিটোলার সহকারী কমিশনার বরাবরে প্রতি ২/১ দিন পর পর নতুন নতুন তালিকা প্রেরণ করে পান রপ্তানীতে বাধা সৃষ্টি করেন। চাঁদা দিলে পান রপ্তানীকারকের তালিকা সহকারী কমিশনারের বরাবরে প্রেরণ করেন, চাঁদা না দিলে রপ্তানীকারকের তালিকা হতে নাম বাতিল করে সহকারী কমিশনার বরাবর নতুন তালিকা প্রেরণ করেন। প্রতি রপ্তানীকারক মাসে সর্বোচ্চ ৩০০ বাস্কেট পান রপ্তানী করতে পারবেন। ৩০০ বাস্কেটের উপরে পান রপ্তানীকারক সমিতি কোন অনুমোদন দেয় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত