পদ্মের রাজ্যে এবার শুধু পদ্মপাতা

যে বিলে বর্ষায় ফুটন্ত পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন দর্শনার্থীরা, এবার সেখানে দেখা মিলছে শুধু পদ্মপাতার।

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

পাবনা জেলার অন্যতম বড় বিল ডিকশি বিল। চাটমোহর উপজেলার ফৈলজানা ও পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত এই বিল প্রতি বছর বর্ষার পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ষা শেষে পানি কমে গেলে বিস্তীর্ণ বিলের জমি পরিণত হয় ফসলের মাঠে।

তবে এবার বিলে পর্যাপ্ত পানি না আসায় এখনও আগের মতো পানিতে ভরেনি ডিকশি বিল। স্থানীয়দের কাছে এটি ডিকশির বিল নামে পরিচিত হলেও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ‘পদ্ম বিল’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।

প্রতিবছর বর্ষায় এই বিলে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় পদ্ম, শাপলা ও শালুক। ফুটন্ত পদ্ম, বাড়ন্ত শাপলা আর শালুকের সমারোহে বিলজুড়ে তৈরি হয় নয়নাভিরাম দৃশ্য। সেই সৌন্দর্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। বর্ষাকালে তাই বিলটিকে ঘিরে পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়।

স্থানীয়রা জানান, অন্যান্য বছর বর্ষায় বিলে গভীর পানি থাকে। তখন বিলের পাড় থেকেই নৌকায় ওঠার সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিলের মাঝামাঝি কিছু পানি থাকলেও তা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি যেসব এলাকায় প্রতিবছর অসংখ্য পদ্ম ও সাদা শাপলা ফুটে থাকে, সেখানেও এবার তেমন ফুলের দেখা নেই।

সাদা ও গোলাপি ফুলে যে বিল বর্ষায় অন্য রূপ ধারণ করে, এবার সেখানে পদ্মপাতা থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত ফুলের সমারোহ। পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্য দেখতে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই তাই হতাশ হয়ে ফিরছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রাকৃতিক জলাশয় ও বিল-ঝিল ভরাট, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক মাছ চাষ, পানি দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি থেকে পদ্ম ও শাপলা হারিয়ে যাচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণেও এসব জলজ উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

ডিকশির বিলপাড়ের বাসিন্দা ও ডিঙি নৌকার মাঝি শাহাদাত বলেন, বছরের অন্য সময়ে তিনি কৃষিকাজ করে সংসার চালান। বর্ষায় কৃষিকাজ কম থাকায় এই সময়ে নৌকা চালিয়ে আয় করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবছর বিলে পানি এলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে ঘুরতে আসেন। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় ডিঙি নৌকা নিয়ে তারা পদ্ম বিল ঘুরে দেখেন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখতে ভিডিও ও সেলফি তোলেন। তবে এবার পদ্ম ফুল তেমন না ফোটায় নৌকা নিয়ে ঘোরার আগ্রহও কমেছে বলে জানান তিনি।

আরেক মাঝি রহিম বলেন, পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্য দেখতেই মানুষ এই বিলে আসে। বর্ষায় অন্য কাজ না থাকায় তাঁর মতো নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ বাড়তি আয়ের আশায় কষ্ট করে নৌকা কিনে ভাড়ায় চালান। কিন্তু বিলে পানি ও পদ্ম-শাপলা না থাকলে পর্যটক আসবেন না। তাই বিলটি রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ চান তিনি।

চাটমোহর উপজেলা থেকে ঘুরতে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, বিলে সেচ ও ক্ষতিকর যন্ত্র দিয়ে মাছ ধরার সময় পদ্ম-শাপলার মূল বা লতা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে দিন দিন এসব জলজ ফুল কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বিলে ফুটে থাকা পদ্মের কলি ও ফুল তুলে নিয়ে যাওয়ায় ফুলের সংখ্যাও কমছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা সজীব বলেন, জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পর বৃষ্টির পানি সেগুলো ধুয়ে বিলে নিয়ে যায়। এতে বিলের পানি দূষিত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরাপ্রবণ আবহাওয়াও পদ্ম-শাপলার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। বিল রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পদ্ম বিলে আসেন। বছরে তিন থেকে চার মাস ডিকশির বিলে পানি থাকায় এখানে পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

পাবনা থেকে ঘুরতে আসা রাব্বি বলেন, ফোনে ভিডিও দেখে এবং বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প শুনে পদ্ম বিল দেখতে এসেছেন। গজারিয়া ব্রিজ থেকে একটি ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বিলের মাঝখানে গিয়ে পদ্মপাতা ছাড়া তেমন কিছু দেখতে পাননি। তবে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর মতে, বিলপাড়ের মানুষ শুকনো মৌসুমে ফসল চাষ এবং বর্ষায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে নৌকায় বিল ঘোরাও বেশ আনন্দের।

এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, চায়না জালের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বিলের মাঝিদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে পদ্ম বা শাপলার কোনো ক্ষতি না হয়। এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি বিলে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা সচেতন হলে বিল ও এর জলজ উদ্ভিদগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত