সবুজ অর্থনীতির রূপান্তরে ব্যাংকিং খাতকে এগিয়ে আসতে হবে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:২০ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশের সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে সবুজ অর্থনীতির প্রসার এখন সময়ের দাবি। এ রূপান্তরে শিল্প, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রিন ফাইন্যান্সের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের বিশেষ আয়োজন ‘গ্রিন ইকোনমি’তে কথা বলেছেন জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মজিবর রহমান : বাংলাদেশের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, কৃষি, জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বড় অংশ আসে ব্যাংক থেকে। তাই ঋণের অর্থ যদি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয় ও দূষণ কমানোর প্রকল্পে যায়, তাহলে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর আরও দ্রুত হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের কত শতাংশ বর্তমানে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে যাচ্ছে?

মজিবর রহমান : জনতা ব্যাংক গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৬ ভাগ সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োজিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে অর্থায়ন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কতটা সফল?

মজিবর রহমান : ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। তবে নীতিমালা বাস্তবায়নে সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণ, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং গ্রিন প্রকল্প শনাক্ত করার দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও সচেতন করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?

মজিবর রহমান : পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। অনেক উদ্যোক্তার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। কিছু প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন করাও কঠিন। তাই ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর : নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আপনার ব্যাংকের কী উদ্যোগ রয়েছে?

মজিবর রহমান : এসব খাতকে আমরা সম্ভাবনাময় মনে করি। সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তারা আরও বেশি আগ্রহী হবেন।

দেশ রূপান্তর : তৈরি পোশাক, চামড়া ও টেক্সটাইলসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকে সবুজ করতে ব্যাংকগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে?

মজিবর রহমান : এসব শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এখন অপরিহার্য। ব্যাংকগুলো আধুনিক প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থায় বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের গ্রিন ট্রানজিশনে কী ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন?

মজিবর রহমান : এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়ন প্রয়োজন। অনেক উদ্যোক্তার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ থাকলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে তারা পিছিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে পুনঃঅর্থায়ন ও বিশেষ তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশ রূপান্তর : গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর কী নীতি সহায়তা প্রয়োজন?

মজিবর রহমান : পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাড়ানো, সুদে প্রণোদনা দেওয়া এবং গ্রিন প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে বিনিয়োগ বাড়বে।

দেশ রূপান্তর : নিজেদের কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমাতে জনতা ব্যাংকের কী উদ্যোগ রয়েছে?

মজিবর রহমান : ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও ডিজিটাল ও কাগজবিহীন করার দিকে আমরা এগোচ্ছি। অনলাইন ও ডিজিটাল সেবা বাড়লে কাগজের ব্যবহার, যাতায়াত এবং পরিচালন ব্যয় কমবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগও বিবেচনা করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্সকে কোথায় দেখতে চান?

মজিবর রহমান : আগামী পাঁচ বছরে গ্রিন ফাইন্যান্সকে ব্যাংকিং খাতের মূলধারার অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে চাই। শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্প নয়, শিল্প, কৃষি, এসএমই ও অবকাঠামো, সব ক্ষেত্রেই পরিবেশগত বিষয়কে ঋণ দেওয়ার সময় বিবেচনায় নিতে হবে। জনতা ব্যাংকও টেকসই অর্থায়ন বাড়াতে এবং দেশের সবুজ রূপান্তরে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত