বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর, গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ, রপ্তানিমুখী শিল্পের গ্রিন ট্রানজিশন, এসএমই খাত এবং ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের বিশেষ আয়োজন ‘গ্রিন ইকোনমি’ নিয়ে কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসাইন।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
মো. আলতাফ হুসাইন : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের বড় একটি অংশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন, সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রিন ফাইন্যান্স ও টেকসই ব্যাংকিংয়ের প্রসার শিল্প খাতকে কম কার্বননির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় যেতে সহায়তা করবে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাংকিং খাতকে আরও পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের কত শতাংশ বর্তমানে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সে যাচ্ছে? আগামী দিনে এ খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা কী?
মো. আলতাফ হুসাইন : বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে গ্রিন ও সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী এ খাতে অর্থায়ন ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, পানি সংরক্ষণ, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও টেকসই অবকাঠামোতে বিনিয়োগকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ভবিষ্যতে গ্রিন ফাইন্যান্সের জন্য আরও বেশি তহবিল বরাদ্দ এবং নতুন নতুন পরিবেশবান্ধব প্রকল্পকে অর্থায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করতে সহজ ও শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যাংকের বিনিয়োগকে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে দেশের সবুজ অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখা।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কতটা সফল? নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি?
মো. আলতাফ হুসাইন : বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিমালা ব্যাংকিং খাতে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলোও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে নীতিমালা প্রণয়ন থেকে বাস্তব প্রয়োগে যেতে হলে প্রকল্পের প্রাপ্যতা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, পরিবেশগত মান যাচাই এবং যথাযথ মনিটরিংয়ের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আমরা এটিকে ঘাটতি হিসেবে নয়, বরং বিকাশমান একটি খাতের পরিণত হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি। এখন প্রয়োজন ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে গ্রিন প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরি করা এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করা। তাহলে গ্রিন ফাইন্যান্স শুধু একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পালনের বিষয় না থেকে বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়ন ও সবুজ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
দেশ রূপান্তর : গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?
মো. আলতাফ হুসাইন : গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে একক কোনো বাধাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়নযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য গ্রিন প্রকল্পের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং উদ্যোক্তার সক্ষমতা। অনেক উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে ব্যাংকের দিক থেকেও প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, আর্থিক সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ রূপান্তর : তৈরি পোশাক, চামড়া, টেক্সটাইলসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় নিতে ব্যাংকগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে?
মো. আলতাফ হুসাইন : দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পকে সবুজ উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত অর্থায়নের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন-সহযোগীর ভূমিকা রাখতে পারে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও টেক্সটাইল শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরপ্যানেল স্থাপন, ইটিপি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগে সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন।
ব্যাংকগুলো গ্রিন ফাইন্যান্সের মাধ্যমে এসব বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান পূরণে সহায়তা করতে পারে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। ইসলামী ব্যাংকও টেকসই শিল্পায়নের অংশ হিসেবে যোগ্য রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে আর কী ধরনের নীতি সহায়তা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মো. আলতাফ হুসাইন : গ্রিন ফাইন্যান্স বাড়াতে সবচেয়ে কার্যকর হবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প ব্যয়ের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা এবং অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে এসএমই ও নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ক্রেডিট গ্যারান্টি, গ্রেস পিরিয়ড, নমনীয় পরিশোধব্যবস্থা ও প্রণোদনার মতো সহায়তা ঝুঁকি কমাতে পারে। একই সঙ্গে গ্রিন প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক ও কর সুবিধা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াবে। পাশাপাশি গ্রিন প্রকল্পের পরিবেশগত মান যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা প্রয়োজন। নীতিসহায়তা, সাশ্রয়ী পুনঃঅর্থায়ন ও বাজারভিত্তিক প্রণোদনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রবাহ বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও কাগজবিহীন ব্যাংকিং চালুর ক্ষেত্রে কী উদ্যোগ রয়েছে?
মো. আলতাফ হুসাইন : নিজস্ব কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ কমাতে ইসলামী ব্যাংক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়, ডিজিটালাইজেশন এবং কাগজের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। শাখা ও অফিসগুলোতে ডিজিটাল ব্যাংকিং, ই-স্টেটমেন্ট, অনলাইন সেবা ও ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পেপারলেস ব্যাংকিংয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্সকে কোথায় দেখতে চান?
মো. আলতাফ হুসাইন : আগামী পাঁচ বছরে গ্রিন ফাইন্যান্সকে ব্যাংকিং খাতের কোনো আলাদা সেগমেন্ট হিসেবে নয়, বরং মূলধারার অর্থায়নের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে চাই।
একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও ডিজিটাল, কাগজসাশ্রয়ী ও জ্বালানি-দক্ষ করার মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব কমাতে চাই।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মো. আলতাফ হুসাইন : আপনাদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ। দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে আমরা আনন্দিত। আশা করি, গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রসারে ব্যাংকিং খাত, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগ বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতির যাত্রাকে আরও গতিশীল করবে।