সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ১৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ দেশে এসেছে। দূর দেশে জীবিকার তাগিদে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরবেন না এই নির্মম সত্য মেনে পরিবারের স্বজনরা অপেক্ষায় ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সেই অপেক্ষারও অবসান হলো। প্রিয়জনরা ফিরেছেন, তবে কফিনে।
গতকাল বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪০ ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো পাঠানো হয় নিহতদের গ্রামের বাড়িতে। গত ৯ আগস্ট রিয়াদের শিফার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করে।
গতকাল বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একে একে যখন কফিনগুলো স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন বিমানবন্দরজুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। কেউ এসেছিলেন বাবা হারানোর শোক নিয়ে, কেউ স্বামীকে শেষবারের মতো দেখতে, কেউ ভাইয়ের মুখটি আরেকবার দেখবেন বলে। কিন্তু যারা বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের ফিরতে হলো এমন এক বাক্সে, যার ভেতর নেই কোনো কথা, নেই ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা আছে শুধু নিথর শরীর। বিমানবন্দরে প্রিয়জনের লাশ দেখে কান্নার রোল পড়ে। এতে ভারী হয়ে ওঠে বিমানবন্দরের পরিবেশ।
রিয়াদের সেই আগুন শুধু একটি কারখানা পুড়িয়ে দেয়নি; পুড়িয়ে দিয়েছে পরিবারগুলোর স্বপ্নও। যে মানুষটি মাস শেষে টাকা পাঠাতেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিতেন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কিনে দিতেন কিংবা সংসারের অভাব মেটাতেন, হঠাৎ তার পাঠানো টাকা বন্ধ হয়ে গেল। তার চেয়েও বড় হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে তাদের অনুপস্থিতি। পরিবার থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের ঘিরে থাকে তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ। ভোরে কাজে যাওয়া, দীর্ঘ সময় পরিশ্রম, সীমিত আয় থেকে জমিয়ে দেশে টাকা পাঠানো এইভাবেই চলে তাদের জীবন। অথচ কর্মস্থলে নিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিই কখনো কখনো কেড়ে নেয় জীবন।
রিয়াদের সোফা কারখানায় আগুন লাগার পর মুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়ে প্রাণ হারান ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক। তাদের স্বজনরা তখনও জানতেন না, প্রিয় মানুষটি জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কীভাবে কাটিয়েছেন। দূর দেশে স্বজনের অপমৃত্যুতে শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অসহায়ত্বও। শেষবারের মতো দেখতে চাইলেও ছুটে যাওয়া যায় না। হাসপাতাল বা মরদেহ শনাক্তকরণ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা যায় না। শুধু দুর্বিসহ অপেক্ষা।
গতকাল বিমানবন্দরে মরদেহ হস্তান্তরের দৃশ্য যেন প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতার আরেকটি প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। যারা একসময় বিমানবন্দরে প্রিয়জনকে বিদায় দিয়েছিলেন, তারাই এবার বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণ করেছেন। বিদায়ের সময় হয়তো কেউ বলেছিলেন ‘সাবধানে থেকো।’ কেউ হয়তো বলেছিলেন, ‘ছুটি পেলেই চলে এসো।’ কেউ হয়তো সন্তানের জন্য খেলনা চেয়েছিল, কেউ মায়ের জন্য ওষুধ। কেউ হয়তো ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সবই ফিকে হয়ে গেছে একটি দুর্ঘটনায়।
জানা গেছে, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্তে আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় তাদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। দেশে ফেরা ৯ জনের মধ্যে সাতজনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গন্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন ইসলাম, মোহন আলী ও তার ছোট ভাই সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরকার। অন্য দুইজনের একজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলাম এবং অপরজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রামের শ্যামল উদ্দিন।
লাশ হস্তান্তর মূহূর্তে বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের উদ্যোগে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মরদেহগুলো স্বজনদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি জানাজা ও দাফনের জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহত ৯ কর্মীর প্রতিটি পরিবারে লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন আর্থিক অনুদান বাবদ ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।