স্মরণে রাখা জরুরি, এই ভূখণ্ডের গণমানুষের অধিকার-স্বাধিকারের আন্দোলন-সংগ্রামে এবং অর্জনে সংস্কৃতির চেতনা ও জাগরণ ব্যাপক অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে। ২৬ আগস্ট ‘হুমকিতে ছোট হচ্ছে সংস্কৃতি অঙ্গন’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এই প্রেক্ষাপটে সংগতই প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, সমাজে অন্ধকারের ছায়া কি বিস্তৃত হচ্ছে? প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নৌকাবাইচ, লোকগান, লোকনাট্যও বন্ধ কিংবা হামলার শিকার হচ্ছে। ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন নামের ব্যানারে, আবার কখনো কোনো ব্যানার ছাড়াই সাধারণ কিংবা সচেতন মানুষের কথা বলে অনুষ্ঠান প- করে দেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতজনরা গত দুই বছর ধরে চলা এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কিংবা কনসার্ট সর্বত্রই এক ধরনের ‘মবভীতি’ তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধের ধুয়া তুলে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার পথে এমন প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা যারা তৈরি করছেন আমরা তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা মনে করি না।
আমাদের স্মরণে আছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ‘মব’ সমাজে শুধু ক্ষতই সৃষ্টি করেনি, আইনের শাসনকেও বারবার অভিঘাত করেছে। এর কোনো প্রতিবিধান তো হয়ইনি, উপরন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি রাষ্ট্র ও প্রশাসন ‘মব’ সৃষ্টিকারীদের কাছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতজানু। শুভবোধসম্পন্ন নাগরিক সমাজ তখন সংগতই মনে করেছে, আইনের চেয়ে পেশিশক্তিই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকার শাসনভার গ্রহণ করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল অনেকেই দৃঢ়তায় উচ্চারণ করেন, কোনোরকম জবরদস্তি বরদাস্ত করা হবে না। আমাদের এও স্মরণে আছে, আজ যারা সরকারে তাদের অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে স্বেচ্ছাচারীদের আস্ফালনের কঠিনভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বর্তমানে নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের ওপর যে কোনো রকম বৈরী ছায়া অনভিপ্রেত-অনাকাক্সিক্ষত। আমরা সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার পথে সৃষ্ট বাধার প্রতিবাদ জানাই ও এর প্রতিবিধানের দাবিও রাখি। আমরা সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে এই অপপ্রবণতা আমলে নেওয়ার তাগিদও দিই। অপতৎপরতা ঠেকাতে কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপরও জোর দিচ্ছি। একই সঙ্গে এসব ঘটনাবলির উৎসে নজর দেওয়াও সমভাবেই জরুরি মনে করি।
সরকার ও প্রশাসনের কয়েকজন দায়িত্বশীল এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরে যে ‘নরম’ ব্যাখ্যা কিংবা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এমনটি নয়, আমরা আশা করি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপুষ্ট এই সরকার আমাদের সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের পথে বাধার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে। আমরা আরও মনে করি, সাংস্কৃতিক ধারার বিরুদ্ধাচরণ ধর্ম, সমাজ ও আপামর মানুষকে পঙ্কিল আবর্তে নিমজ্জিত করছে। সংস্কৃতিই যুগ যুগ ধরে সমাজকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে চলার শক্তি জুগিয়েছে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়, নৈতিকতা এবং মননশীল সামগ্রিক প্রকাশ ও বিকাশই অগ্রগতির সড়ক চওড়া করে। আত্মপরিচয় রক্ষায় নিজস্ব ঐতিহ্য-ইতিহাস টিকিয়ে রাখতে সংস্কৃতি প্রধান ভূমিকা পালন করে, তাও মনে রাখা দরকার। একই সঙ্গে মূল্যবোধের উন্নয়ন ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা সমাজে অসহিষ্ণুতা, অপরাধ ও বিভাজন কমায়। মানবিক সমাজ গঠনে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিকতা জাগিয়ে তোলে। জীবনের সব আচার, যাপিত জীবনের উপকরণ, ভাষা, উৎপাদনব্যবস্থা এমনকি মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে ব্যক্তি, পারিবারিক, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের গতিশীল অংশগুলো সংস্কৃতির অনুষঙ্গ।
ইতিহাসের অধ্যায়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলা সুলতানি আমলে সাহিত্য–সংস্কৃতির অভূতপূর্ব জাগরণ-চিত্র। ওই আমলের শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতাও এই প্রেক্ষাপটে স্মরণীয়। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, সুলতানি আমল থেকে মোগল আমল পর্যন্ত বাঙালির জীবনাচার, তার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ইরান-পারস্য, তথা মধ্য এশিয়া এবং আরবের থেকে আসা জনগোষ্ঠীর প্রভাব কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অধিকার-স্বাধীনতা-সংস্কৃতিকে দমিয়ে রেখে শুধু উন্নয়নের দর্শন দিয়ে যে রাষ্ট্র-সমাজ পরিচালনা করা যায় না, এই নজিরও তো দূর অতীতের নয়।
সংস্কৃতিচর্চার পথ যাতে কণ্টকাকীর্ণ না হয় সেদিকে আমরা সরকারের সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি প্রত্যাশা করি। কূপম-ূকতা নয়, আমরা চাই সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে পড়–ক সর্বত্র।