যেখানে বর্ষায় থাকার কথা থইথই পানি, নৌকার চলাচল আর মাছ ধরার ব্যস্ততা,সেখানে এখন চোখে পড়ে কচুরিপানার বিস্তীর্ণ সবুজ চাদর। দূর থেকে দেখতে মনোরম হলেও এই সবুজের আড়ালেই জমছে বড় সংকট। পানি নামতে দেরি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, কমছে মাছের প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র, সংকুচিত হচ্ছে নদী-নালা। একসময় যে চলনবিল ছিল উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণভূমি, আজ সেটিই যেন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ।
নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পানির ওপর পুরু হয়ে জমে আছে কচুরিপানা, কোথাও নদী ও খালের মুখ আটকে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিলের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আসন্ন রবিশস্য মৌসুম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো পানি নামতে না পারলে সরিষা, গম ও ইরি-বোরো ধানের আবাদ পিছিয়ে যাবে। একই সঙ্গে জমি থেকে কচুরিপানা সরাতেও বাড়তি খরচ গুনতে হবে।
বিলপাড়ের কৃষক ফারুক হোসেন, ময়েজ উদ্দিন ও হাসান আলী জানান, কচুরিপানা অপসারণে প্রতি বিঘায় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। তাদের ভাষ্য, সময়মতো পানি না নামলে জমি প্রস্তুত করা কঠিন হবে, এতে ফসলের মৌসুমও পিছিয়ে যেতে পারে।
নদী-খাল ভরাট, থেমে যাচ্ছে পানির পথ
কৃষি ও মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিলের সমস্যা শুধু কচুরিপানা নয়। অপরিকল্পিত সড়ক, বসতবাড়ি, বাঁধ, পুকুর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বহু জায়গায় সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানীসহ বিলের সঙ্গে যুক্ত নদী ও নালাগুলো দীর্ঘদিন যথাযথভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় পলি জমে নাব্যতা কমেছে।
বর্ষায় উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা এসব বাধার মুখে ভাটিতে যেতে না পেরে বিল ও নদীর বিভিন্ন অংশে আটকে থাকে। অবৈধ সোঁতিজাল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিল অঞ্চলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১০ কিলোমিটার। এর বড় অংশ পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। একসময় এসব খাল-নালা থেকে হাজার হাজার কৃষক সেচের পানি পেতেন। এখন অনেক এলাকায় সেই সুবিধা আর নেই।
কমছে প্রাকৃতিক মাছ
চলনবিলের সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে মৎস্যসম্পদেও। নদী-খাল ভরাট, পানির গভীরতা কমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, কচুরিপানার বিস্তার, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার—সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক মাছের আবাস ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, সংযুক্ত নালা-খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ প্রাকৃতিক মাছের জন্য বড় হুমকি। মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ধরে রাখতে হলে নালা-খাল পুনঃখনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মৎস্য আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি।
কচুরিপানার ঘন স্তর পানিতে আলো ও অক্সিজেন প্রবাহেও প্রভাব ফেলে। ফলে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছোট হচ্ছে চলনবিল
চলনবিল শুধু একটি বিল নয়, এটি পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জজুড়ে বিস্তৃত বিশাল জলাভূমি ব্যবস্থা। একসময় এর বিস্তার ছিল আরও বড়। সময়ের সঙ্গে দখল, পলি জমা, অবকাঠামো নির্মাণ ও পানিপ্রবাহের পরিবর্তনে এর আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, রেললাইন, মহাসড়ক, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্লুইসগেট এবং বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বহু জায়গায় প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের ধারাকে বদলে দিয়েছে। ফলে একদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট—দুই ধরনের সমস্যাই এখন দৃশ্যমান।
ভূগর্ভস্থ পানিতেও বাড়ছে চাপ
বর্ষায় বিলের এক অংশ কচুরিপানা ও জলাবদ্ধতায় ভোগে, আবার মার্চ-এপ্রিল এলেই দেখা দেয় উল্টো চিত্র। নদী ও খাল শুকিয়ে গেলে বোরো আবাদের জন্য কৃষকদের নির্ভর করতে হয় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর।
অনেক এলাকায় পানি পেতে সেচযন্ত্র বসানোর জন্য মাটি আরও গভীর পর্যন্ত খুঁড়তে হচ্ছে বলে জানান কৃষকেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-উপরিস্থ পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা দুর্বল হলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাত হোসেন বলেন, নদী-নালা ও খালে পলি জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে কৃষি ও মৎস্য উভয় ক্ষেত্রেই।
সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি
চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে চলনবিল রক্ষা সম্ভব নয়। পানি সম্পদ, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও ভূমিসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধ, প্রয়োজনীয় খাল পুনঃখনন এবং পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান নাজলি পারভিন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে চলনবিলের আবহাওয়া ও পরিবেশগত ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। তার মতে, বিলকে বাঁচাতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
দূর থেকে কচুরিপানায় ঢাকা চলনবিলকে সবুজ ও সুন্দর মনে হতে পারে। কিন্তু কৃষকের চোখে এই সবুজ এখন উদ্বেগের রং। যে বিলে জলের ঢেউয়ে নৌকা চলত, মাছের ঝাঁক ছুটত, ফসলের স্বপ্ন বুনতেন কৃষকেরা—সেই বিল আজ দখল, পলি, জলাবদ্ধতা আর কচুরিপানার ভারে ক্লান্ত।
চলনবিলের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার নয়, প্রয়োজন নদী-খাল পুনরুদ্ধার, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা। নইলে একদিন হয়তো চলনবিল থাকবে মানচিত্রে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার জল, মাছ, কৃষি আর চিরচেনা জীবন।