জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে আন্দোলনকারীদের পানি পান করাতে গিয়ে গুলিতে নিহত আব্দুর রহমান জিসান হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাউছার হুসাইন গত ৮ জুলাই ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্রটি জমা দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৬ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক।
যেভাবে নিহত হন জিসান
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে মাতুয়াইলের ২ নম্বর তিতাস গ্যাস রোড এলাকায় আন্দোলনকারীদের পানি পান করাতে বাসা থেকে বের হন জিসান।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ওই সময় পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। জাহাঙ্গীর আলমের হাতে থাকা একটি কাটা রাইফেল থেকে ছোড়া গুলি জিসানের ডান চোখের ওপর দিয়ে মাথায় ঢোকে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জিসানের মৃত্যুর নয় দিন পর, ২৯ জুলাই তার স্ত্রী রাবেয়া মিষ্টি আত্মহত্যা করেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে যাদের নাম
শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয় ছাড়াও আসামির তালিকায় রয়েছেন তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সালমান এফ রহমান, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, তাজুল ইসলাম, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক ও জাহাঙ্গীর কবীর নানক।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও মশিউর রহমান সজল, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার ও যাত্রাবাড়ীর সাবেক ওসি আবুল হাসানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের আরও কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
আন্দোলন দমনের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং পরদিন ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, ১৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে দমনের সিদ্ধান্ত হয়। শেখ হাসিনার নির্দেশনা এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিদেশ থেকে দেওয়া বার্তার মাধ্যমে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় অংশ নেয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
আদালতে মামলা
জিসান হত্যার ঘটনায় তার বাবা বাবুল মিয়া ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট আদালতে মামলা করেন। শুরুতে আসামি ছিলেন ২৭ জন। তদন্তে কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও মশিউর রহমান সজলের সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের যুক্ত করা হয়।
মামলার আসামিদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন এবং একজন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। অন্যরা পলাতক। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ বলেন, অভিযোগপত্রের কপি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।