নীতিমালা ছাড়াই উপাচার্য ডুবছে বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাস্তবে। বরং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের ঘটনা ঘটছে আগের মতোই। অভিজ্ঞতার পরিবর্তে প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুগত্য। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত শিক্ষকদেরও উপাচার্য পদে আসীন হতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সার্চ কমিটি গঠন করা হলেও তা ছিল কাগজে। বাস্তবে যা হয়েছে তা হলো কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। একই অবস্থা বর্তমান সরকারের আমলেও। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সার্চ কমিটি পুনর্গঠন হওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে কারা ভিসি হচ্ছেন, তাদের যোগ্যতা কী তা নিয়ে চলছে নানামুখী বিতর্ক।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের টানা ২৮ দিনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানি ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে অব্যাহতি পাওয়া অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানি ও অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদকে পরে পুরস্কার দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অধ্যাপক ড. মামুন অব্যাহতি পেয়েছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই তাকে উপাচার্য বানানো হয়েছে।

একইভাবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য হিসেবে চলতি বছরের ২৪ মার্চ নিয়োগ পান অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ। তাকেও এর আগের বছরের ২৪ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও অনশনের মুখে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে আবার উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকেও উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বিভাগীয় প্রধান থাকা অবস্থায় অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে অনাস্থা জানিয়েছিলেন ২১ জন শিক্ষক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭২-এর অধ্যাদেশের আওতায় থাকা চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, এমনকি যোগ্যতার কোনো মাপকাঠিও নেই। কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে স্বনামধন্য শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। অথচ সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট নন, এমন শিক্ষকরা নিয়োগ পেয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তন করে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল অথবা ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সদস্য।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে সম্পূর্ণ অযোগ্য ও অথর্ব লোকদের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মান ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগপ্রাপ্তদের থেকেও খারাপ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় বড় প্রজেক্ট থেকে লুটপাট করতে অযোগ্য ও অথর্ব লোকদের ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি চক্র কাজ করছে। অথচ আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি তার দলের লোকদের ভিসি বানাবে এ নিয়ে আপত্তি নেই। বিএনপিতে অনেক যোগ্য ও দক্ষ লোক আছেন, তাদের নিয়োগ দিলে আমরা বাহবা দিতাম। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্যদের মনোনয়ন ব্যথিত করে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভালো হলেই যে ভালো প্রশাসক হবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে একজন অধ্যাপককে উপাচার্য করার পর রাতারাতি তার দায়িত্বের পরিধি বদলে যায়। এতদিন যেখানে তার প্রধান কাজ ছিল পাঠদান, গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম, উপাচার্য হওয়ার পর তাকেই সামলাতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, অর্থ, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ, কেনাকাটা, টেন্ডার, আইনগত বিষয়, অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো। সাধারণত দেখা যায়, উপাচার্যের মতো বিশাল দায়িত্ব নেওয়ার আগে একজন শিক্ষককে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি আর্থিক বিধি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। এতে করে তৈরি হয় নানামুখী সংকট।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করলেও প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে বসার জন্য আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকেন। থাকে শত শত কোটি টাকার বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা। একজন নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে আগে থেকে কাজ করা কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, হিসাব শাখা, রেজিস্ট্রার দপ্তর কিংবা দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করেন। এই নির্ভরশীলতা স্বাভাবিক হলেও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বর্তমানে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক অধ্যাপক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগে আমার বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার কেনাকাটার জন্য পিপিআর সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, আর্থিক বড় কোনো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা নেই। শিক্ষক হিসেবে আমার ছোট ছোট প্রজেক্ট সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু এখন তো বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝখানে পড়েছি। আমার মনে হয়, উপাচার্যদের একটি পোল করে তিন মাস বা ছয় মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো উচিত। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় সামলাতে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।’

একজন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। কোন ফাইল কোথায় আটকে থাকে, কোন প্রকল্পের কী অবস্থা, কোন নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বিধি কী বলছে এসব বুঝতে তাকে সহায়তা করতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাগুলোর একটি অর্থ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা। একজন উপাচার্যকে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট অনুমোদন, ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কেনাকাটা, টেন্ডার, নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, গবেষণা বরাদ্দসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অথচ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, আর্থিক বিধি, অডিট আপত্তি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে একজন উপাচার্যের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যদি প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে পাঠাতে পারতাম তাহলে ভালো ফল পেতাম। উপাচার্য কিন্তু বিশাল দায়িত্ব। আর্থিক, প্রশাসনিক ও নিয়োগের মতো জটিল ও কঠিন বিষয়ে যদি কারও ওপর নির্ভর করতে হয় তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক বলেন, ‘ভবিষ্যতে ভিসি নিয়োগে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন হলে এ বিষয়ে কাজ করা হবে। সার্চ কমিটি চেষ্টা করছে যোগ্য লোকদেরকেই নিয়োগ দিতে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত