মানুষের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র প্রকাশ পায় কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গির মাধ্যমে। কথাবার্তার বিষয় ও শব্দচয়ন, বাক্যের শৈলী, স্বরের উত্থান-পতন, বলার ভঙ্গি ও বর্ণনার তেজস্বিতা বুঝিয়ে দেয় বক্তা কেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। নবীজি (সা.) বাচনিক প্রজ্ঞার সর্বময় গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত কথা বলতেন না এবং যেখানে কথা বলা দরকার, সেখানে নিশ্চুপ থাকতেন না। তিনি ছিলেন পরিমিতভাষী। তার মেজাজে যেমনি ছিল গম্ভীরতা, তেমনি ছিল রসিকতা। তার সংক্ষিপ্ত বাক্যগুলো ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করত।
যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন, ‘যখন আমরা দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, তখন রাসুল (সা.) তাতেও অংশ নিতেন। যখন আমরা আখেরাতের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, তখন তিনিও সেই বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন। আমরা যখন খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে কোনো কথা বলতাম, তখন তিনিও তাতে যোগ দিতেন। (শামায়েলে তিরমিজি) কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও তার মুখ দিয়ে সত্য ও ন্যায্য কথা ছাড়া আর কিছুই বের হয়নি।
হুনাইনের যুদ্ধের পর গনিমত বণ্টনের সময় যখন নওমুসলিমদের তাদের প্রাপ্য থেকে অধিক পরিমাণে দিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন আনসারদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এসব বুঝতে পেরে রাসুল (সা.) আনসারদের জন্য ভিন্ন একটা তাঁবু গেড়ে তাদের মায়ামাখা বাচনভঙ্গিতে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বলেন, বিজয়ের পর নওমুসলিমরা উট, ঘোড়া ও গনিমত নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আর আমার আনসার সাহাবিরা আল্লাহ ও তার রাসুলকে নিয়ে ঘরে ফিরবে। (সহিহ বুখারি) তার একটি কথায় গোটা আনসার সাহাবিদের কাফেলায় মুহূর্তের মধ্যে কান্নার রোল বয়ে যায়। তারা সমস্বরে বলে ওঠে, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট আছি।
কথা বলার সময় তিনি প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করতেন, এমনকি শ্রোতারা চাইলে তা গণনাও করতে পারত। তিনি ছিলেন আরবের সর্বাপেক্ষা সুভাষী মানুষ। তার ভাষার মান যেমন উৎকৃষ্ট ছিল, তেমনি তা ছিল সরল ও সহজবোধ্য। কখনো তিনি নিচুমানের ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি দাওয়াত ও নিজের লক্ষ্যের প্রয়োজনে একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছিলেন। একটা স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গি বানিয়ে নিয়েছিলেন। আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত তার বিখ্যাত উক্তি ‘যুদ্ধ একটা কৌশল’-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটা রাসুল (সা.)-এর বিশেষ ভাষা। তিনি এরূপ বহু ভাষা, পরিভাষা, বাগধারা, উপমা উদ্ভাবন করেছেন।
তিনি লম্বা ভাষণ দিতেন না। ঘন ঘন বক্তৃতাও দিতেন না। সমাজের প্রয়োজনে এবং সার্বিক পরিবেশ অনুসারে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা দিতেন। তিনি মসজিদে বক্তৃতা প্রদানকালে লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। যুদ্ধের ময়দানে বাহনের ওপরে বসে বক্তৃতা করতেন। গুরুত্বারোপের জন্য কখনো কখনো ‘যার হাতে আমার প্রাণ, বা যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, তার শপথ’, এই বলে কথা শুরু করতেন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়