ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে ‘রূপভানের’ ফুলে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। যেদিকে তাকানো যায় শুধু শিম ফুলের দৃশ্যই চোখে পড়ে। এরই মধ্যে শিমের নতুন জাত ‘রূপভান’ বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফুল বাছাই আর গাছের পরিচর্যায় মহাব্যস্ত ঈশ্বরদীর শিমচাষিরা। শিম শীতকালীন সবজি হলেও আগাম জাতের শিম চাষ ও তা থেকে ফলন প্রাপ্তি শুরু হয়েছে ঈশ্বরদীতে।
আসছে শীত, তাই দেশের প্রধান শিম উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে এখন চলছে শিম চাষের জোর প্রস্তুতি। তাই কৃষকরা এখন মহাব্যস্ত। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে ঈশ্বরদীর মুলাডুলিসহ পার্শ্ববর্তী প্রায় ২৫ গ্রামের মানুষ শিম চাষের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শীতকালীন সবজি হলেও শিম চাষের উপযুক্ত সময় হওয়ায় ঈশ্বরদীর প্রায় ৩ হাজার শিমচাষি এখন তাদের নিজ জমি ও খাজনা করা জমিতে রোপণ করা শিম গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এখন মুলাডুলির যেদিকে তাকানো যায় শুধুই শিম ফুলের সমারোহ চোখে পড়ে। গতকাল রবিবার সকালে ঈশ্বরদীর মুলাডুলির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। শিম চাষকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে বিশাল বাজার ও সমিতি। এই বাজার থেকেই উৎপাদিত শিম প্রতিদিন ট্র্যাকে লোড হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। এরই মধ্যে কিছু আগাম জাতের লাগানো ‘রূপভান, অটো ও সাদা’ জাতের শিম বাজারে আসতে শুরু করেছে। আগাম জাতের হওয়ায় প্রতি কেজি শিম ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
একটি সবজি (ফসল) যে, একটি এলাকার নাম বদলে দিতে পারে ঈশ্বরদীর শিম উৎপাদন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ঈশ্বরদীতে এবার চলতি মৌসুমে প্রায় ১,৬০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। তবে এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন তারা। কৃষি বিভাগ আরও জানিয়েছে, গত মৌসুমে ঈশ্বরদীতে ১ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছিল।
ঈশ্বরদীতে শিম চাষের সঙ্গে প্রায় ১১ হাজার পরিবার সরাসরি জড়িত। শিম চাষের কারণে শত শত বেকার যুবক এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। মুলাডুলির বিভিন্ন গ্রামে কয়েক বছর আগেও যেখানে পাকা ঘরবাড়ি তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যেত না, সেই মুলাডুলিতেই শুধু এখন শিম চাষের জন্য পাকা ঘরবাড়ি তৈরির পাল্লা চলছে। মুলাডুলি ছাড়াও ফরিদপুর, আটঘড়িয়া, শেখপাড়া, রামনাথপুর, রাজাপুর, হাজারীপাড়া, পারখিদিরপুর, কচুয়ারামপুর, দুবলাচারা, পতিরাজপুর, গোপালপুর, মাঝগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এখন শিম চাষের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এ এলাকার ৯৫ ভাগ জমিতে শিম চাষ হওয়ার কারণে মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে দেশের শিম বিপণনের প্রধান কেন্দ্র। শিম উৎপাদনের সময় এই মুলাডুলি থেকেই প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ ট্রাক শিম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। ক্রেতা-বিক্রেতার পদভারে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখোরিত থাকে মুলাডুলির শিম বাজার। মৌসুমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার শিম এই বাজার থেকে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। শিম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঈশ্বরদীর শিমচাষিরা একটি মাল্টিপারপাস কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে শিম চাষে খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। মাত্র তিন মাসের এই ফসল প্রতি বিঘায় বিক্রি হয় ৩০ হাজার টাকায়। গত এক সপ্তাহ ধরে মুলাডুলির শিম আড়ৎ থেকে অল্প পরিমাণে শিম বাজারজাত শুরু হয়েছে। সেই পরিমাণ মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মণ।
মুলাডুলির অন্যতম বড় শিমচাষি আমিনুর রহমান (শিম বাবু) জানান, বর্তমানের শিম চাষের পুরো মৌসুম চলছে। নতুন জাত ‘রূপভান’ ও ‘অটো’ নামের বাজারে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগাম আবাদের কারণে ‘রূপভান’ ও ‘অটো’ নামের এই শিম বাজারে ব্যাপক চাহিদা এবং দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০-৫০ মণ শিম বাজারে আসছে। আগামী এক মাসের মধ্যে ব্যাপকভাবে এই শিম বাজারজাত করা হবে।
মুলাডুলি স্টেশন পাড়ার শিমচাষি নজরুল ইসলাম জানান, তার শিমের মাচায় ফুলে ফুলে ভরে গেছে। রূপভান, অটো ও সাদা নামের শিম বাজারে উঠতে শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মোমিন জানান, কৃষকরা এখন মাচা ও ফুল বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত রয়েছে। আগাম জাতের কিছু নতুন শিম বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকরা দামও পাচ্ছেন ভালো। কৃষি বিভাগ শিমচাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, গতবারের চেয়ে এ বছর ফলন ভালো হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।