চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি ও অবহেলা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। ওই ঘটনায় দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১ অনুযায়ী, ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।
গতকাল সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, তদন্ত কমিটির সদস্য এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘কেউ দোষী হলে তার শাস্তি হবে নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রচলিত আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, সেটাই হবে।’
গত ১৪ আগস্ট সীতাকু-ের ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস নির্গত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান। এ ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব একেএম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করেন শিল্পমন্ত্রী।
দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বেনজামিন রিয়াজী জানান, ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের দুর্ঘটনায় চরম নিরাপত্তা গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা এসসিবিএ ব্যবহার না করা, ছুটির দিনে সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী দল না থাকা এবং প্রকৃত শ্রমিকদের হাজিরা তালিকায় অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে, যা প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। এর সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবেশ ছাড়পত্র ও সিসিটিভির অনুপস্থিতিও পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
তদন্তে ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস ২০১১’-এর একাধিক বিধি লঙ্ঘন এবং ইয়ার্ডের সেফটি টিমের পেশাগত অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে শুধু দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হলে একই ধরনের দুর্ঘটনা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
বুয়েট অধ্যাপক ও তদন্ত কমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে অক্সিজেনের ঘাটতিপূর্ণ পরিবেশে পানিতে থাকা সালফেটের সঙ্গে অণুজীবীয় বিক্রিয়ার ফলে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হয়েছিল। পাত্র বা ট্যাংক থেকে পানি নিষ্কাশন কিংবা কাটার সময় ওই গ্যাস হঠাৎ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এর ঘনমাত্রা ১০০ পিপিএমের বেশি হলে তা জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ডি-ব্লাস্টিং বা পানি নিষ্কাশনের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি সঠিকভাবে নিরূপণ এবং বাতাস ও পানিতে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর কাজ শুরুর সুপারিশ করেন তিনি।