দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। গতকাল সোমবার ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দাবির পক্ষে কমিশনের গত দুই মাসের (জুলাই-আগস্ট) কার্যক্রম তুলে ধরেন। যার মধ্যে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অনিয়ম রোধ, কারসাজি বন্ধ এবং বাজার সংস্কারে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে দরেন। এ সময় সামনের দুই মাস (সেপ্টেম্বর ও অক্টবর) কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে চলতি বছরের মধ্যে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও সিসিবিএল পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে অনেকে আলাপ আলোচনায় বলে থাকেন, বর্তমান কমিশন মনে হচ্ছে ঘুমাচ্ছে! আমরা (বর্তমান কমিশন) যোগদানের পরেই দীর্ঘ দিনের প্রতিবন্ধকতা ফ্লোর প্রাইস তুলে দিয়েছি, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি স্বস্তি এনে দিয়েছে। পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকোর শেয়ার জটিলতার সমাধান করা হয়েছে। এ ছাড়া অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাজারবান্ধব মার্জিন বিধিমালা সংশোধন করেছে বর্তমান কমশিন। মিউচুয়াল ফান্ড কাস্টডিয়ান ব্যবস্থা সহজ করেছি। একই সময়ে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ ও বৈঠক করা হয়েছে। মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রমের বেশি কিছু পরিবর্তন ও স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। এতসব কাজের মধ্যে অনেকে আমাদের সমালোচনা করেন, বিএসইসি ঘুমায়, কাজ করে না। আমরা গঠনমূলক সমালোচার জন্য আন্তরিক। তবে যেসব কাজ পুঁজিবাজার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে সেসব বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা আশা করছি।
অনুষ্ঠানটি রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয়’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক ও হোসাইন সাদাত এবং ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কমিশনের কাছে অংশীজনদের অনেকে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের চার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিসিবিএল) ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভালো মানের কোম্পানি তালিকাভুক্তি, আইপিও ব্যবস্থায় পরিবর্তন, টি+১ নিষ্পত্তি এবং ডেরিভেটিভস বাজার চালুর উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
নতুন মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান উদ্যোক্তা বা শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ রেখে আইপিওতে একটি ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছেন মাসুদ খান।
তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি তার মোট মূলধনের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে ছাড়লে এর একটি অংশ নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ এবং অন্য অংশ বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে ছাড়তে পারে। এতে কোম্পানি নতুন মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ারধারীরাও শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন। এ সংক্রান্ত বিধি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এক মাসের মধ্যে আইপিও-সংক্রান্ত নতুন বিধি দেওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভালো কোম্পানি বাজারে আসা শুরু করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগও সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
সিসিবিএলের বোর্ড আগামী এক মাসের মধ্যে পুনর্গঠন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সিসিবিএল গঠন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগোয়নি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।
আধুনিক পুঁজিবাজারে কেন্দ্রীয় কাউন্টারপার্টি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, লেনদেনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ক্লিয়ারিং ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সিসিবিএলের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
লেনদেনের পর এক কার্যদিবসে নিষ্পত্তি বা টি+১ ব্যবস্থা বছরের শেষ নাগাদ চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, বিদেশি ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি এসব পক্ষকে নিয়ে একটি রোডম্যাপও তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ক্রিপ্ট নেটিং চালুর কাজ চলছে। মার্জিন ঋণ, ক্লিয়ারিং, সিসিপি ঘাটতি ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেশন আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাসুদ খান বলেন, ‘মার্কেট তার নিজের শক্তিতে চলবে’ এমন অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন বা দর ওঠানামা দেখা গেলে তদন্ত করা হবে। অনিয়ম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ।
বক্তব্যে বন্ড বাজারের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তার মতে, মূল বাজারে আরও বেশি বন্ড তালিকাভুক্ত হলে মিউচুয়াল ফান্ড, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলের (ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড) কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এর পরিবর্তনের সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন।
ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে বিএসইসির পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে। তবে সব প্রতিষ্ঠানে একইভাবে পরিদর্শন না করে ঝুঁকির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হবে বলে জানান মাসুদ খান।
বড় অর্ডার বা ধারাবাহিক লেনদেনের মাধ্যমে কোনো শেয়ারের বাজারদর প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হবে বলেও জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতেও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সূচক, বিশেষ করে এমএসসিআই সূচকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি এবং বাজার অবকাঠামোর উন্নয়ন দেখা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে পারে।