‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়’ এই গানের লাইনগুলোর ভেতরের প্রতিবাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সম্পর্ক গভীর। এদেশের মানুষের মুখের ভাষা, গান, উৎসব এবং জীবনযাপন কখনোই কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিল না; এগুলো আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, তাই এদের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো প্রশ্ন সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যখন আমাদের ধীরে ধীরে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’তে বিভক্ত করতে শুরু করে, তখন আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশের বাঙালিত্ব কখনো কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড়ানো ছিল না। বরং এই বাঙালিত্বই ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রাণশক্তি। ওই আন্দোলন শুধু মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ছিল না; এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার বোধকে জাগিয়ে তুলেছিল। ষাটের দশকে গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও শিল্প মানুষের মধ্যে স্বাধিকার চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছে। তখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা যেমন মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনেছিল, তেমনই নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্্দীনসহ অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টি বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত সব অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক জাগরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গান ছিল মানুষের সাহসের উৎস, কবিতা ছিল প্রতিবাদের ভাষা আর শিল্পী-সাহিত্যিকরা জনমত গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তখন সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতা আমাদের রাজনৈতিক বিজয়ের পথ উন্মুক্ত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষার সঙ্গে মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে।
স্বাধীনতার পরেও স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার সংগ্রামে সংস্কৃতি মানুষের পাশে থেকেছে। সংস্কৃতির এই রূপ আমাদের ধর্মীয় পরিচয়কে মুছে দেয়নি, দুর্বলও করেনি। বাংলার মাটি বহু শতাব্দী ধরে নানা ধর্ম, বিশ^াস, জাতিগোষ্ঠী ও জীবনধারার মানুষের সহাবস্থানের জায়গা। নদী, মাটি, কৃষি, গ্রাম ও শহরের জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, উৎসব, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা অভিজ্ঞতা মিলিয়েই এদেশের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, কবিগান, পালাগান কিংবা লোককথার কোনো একক ধর্মীয় মালিকানা নেই। এগুলো আমাদের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সহজ করে বললে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি একটি নদীর মতো, নানা দিক থেকে আসা স্রোত মিলেই যার প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। এককভাবে কোনো স্রোতকে পৃথক করে সেই নদীকে বোঝা সম্ভব নয়। জুলাই বিপ্লবের পর আমরা যে বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, সেখানে সংস্কৃতির পরিসর নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, কনসার্ট, বাউল গান কিংবা লোকজ আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবর অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে ফের তা উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরে। কোথাও ধর্মীয় আপত্তি, কোথাও সামাজিক চাপ, কোথাও আবার হুমকিÑ কারণগুলো ভিন্ন হলেও ঘটনাগুলো আমাদের অস্বস্তিকর একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসর কি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে?
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা প্রতিহত করার কথা দায়িত্বশীল অনেকে বলেছেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু কোনো একটি অনুষ্ঠান বন্ধ হলো কিনা, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন মানে কজন শিল্পীর গান বা নাটক পরিবেশন করা নয়; এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও মানসিক সুস্থতা, তরুণদের বেড়ে ওঠা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।’ একটি সুস্থ সমাজে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও এই ভয়শূন্যতা জরুরি। কারণ একজন কিশোর যখন বারবার দেখে তার পছন্দের গান, নাটক, উৎসব কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়া নিয়েও চারপাশের ভয় অবলোকন করে, তখন তার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার আগে চারপাশের ভয়কে হিসাব করতে হবে, এমন একটি ধারণা তৈরি হয়। কোনো স্বাধীন ও সুস্থ সমাজের জন্য এই মানসিকতা স্বস্তিদায়ক নয়। শিক্ষাঙ্গনে সাংস্কৃতিক চর্চা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি অপরিহার্য। আমরা যদি শিক্ষাকে শুধু জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা আর চাকরির প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি, তবে শিক্ষার সবচেয়ে মৌলিক মানবিক দিকটি হারিয়ে ফেলব। প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায়, প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়, নিজেদের ইতিহাস জানার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানাতে সাহায্য করে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য যেমন বিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রবিষয়ক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি, তেমনি কবিতা পাঠ, গান শোনা, নাটক দেখা, খেলাধুলা করা এবং নিজের সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করারও প্রয়োজন আছে।
সমাজের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তরুণদের জন্য কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়; বরং এগুলো তাদের মানসিক উন্নতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। সংস্কৃতির পরিসর খোলা রাখা মানে শুধু গান, নাটক বা কনসার্টের সুযোগ তৈরি করা নয়; একটি প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জায়গাগুলো রক্ষা করা। তবে এই জায়গায় আমাদের নিজেদেরও কিছু আত্মসমালোচনা প্রয়োজন অনুভব করছি। আমাদের বড় ভুলগুলোর একটি হলো, কোনো সৃষ্টিশীল মানুষকে তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বিচার করা। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ আছে। কিন্তু একজন হিন্দু মানুষ নজরুল পড়লে তার ধর্মীয় পরিচয় বদলে যাবে না। তেমনি, একজন মুসলমান রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে প্রভাবিত হলে তার মুসলমানত্বও ক্ষুন্ন হবে না। সাহিত্য ও শিল্পকে মূল্যায়ন করতে হয় তাদের সৃষ্টিশীলতা, মানবিকতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের মাধ্যমে। এটি সংস্কৃতি ধর্মান্তরণের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি অন্যের সৃষ্টির সৌন্দর্য ও মানবিকতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা। একটি সমাজ কতটা পরিণত, উদার ও আত্মবিশ্বাসী, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি এটি। নিজের ঐতিহ্যের কোনো একটি অংশকে বাদ দিয়ে কোনো জাতি তার সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে না। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংস্কৃতির অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। ফলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চর্চার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত। কেউ কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন পছন্দ নাও করতে পারেন। তার আপত্তি থাকতেই পারে। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সেই আপত্তি জানাতে পারেন। কিন্তু ভয় দেখিয়ে, চাপ সৃষ্টি করে কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব একজনের ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করা, তেমনি অন্যজনের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও রক্ষা করা। একটির নামে অন্যটিকে বন্ধ করে দেওয়া নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস। আমরা মুসলমান, এটি আমাদের ধর্মীয় পরিচয়। আমরা বাঙালি, এটি আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়। আমরা বাংলাদেশি, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়। এই পরিচয়গুলো পাশাপাশি থাকতে পারে। একটি পরিচয়কে গ্রহণ করতে গিয়ে অন্যটিকে মুছে ফেলতে হয় না। আজকের তরুণদের চোখে কৌতূহল ও মনে স্বপ্নের পাশাপাশি অনিশ্চয়তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। যদি আমরা তাদের সামনে কেবল আনন্দহীন প্রতিযোগিতা উপস্থাপন করি, তবে তাদের কাছ থেকে সুস্থ ও মানবিক আচরণের প্রত্যাশা করা কঠিন হবে। তাই আমাদের তাদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে জাতির অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের জীবন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন একত্রিত হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু মাদক বা অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করলেই হবে না; পাশাপাশি তাদের জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া, সৃজনশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান করতে শেখানো এই প্রক্রিয়ার মূল উপাদান। আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই? এমন একটি সমাজ যেখানে মানুষ নিজেদের পরিচয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকবে, অন্যের পরিচয়কে সম্মান করবে এবং ভিন্নতার মধ্যে বসবাসের কৌশল আয়ত্ত করবে? নাকি এমন একটি সমাজ যেখানে মানুষ নিজের কথা বলার আগে ভয় পরিমাপ করবে?
আমাদের সংস্কৃতি একরৈখিক নয়; বৈচিত্র্যেই তার সৌন্দর্য। সেই বৈচিত্র্যের সঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কারণ সংস্কৃতির দরজা যত খোলা থাকবে, মানুষের চিন্তার দরজাও ততই থাকবে উন্মুক্ত। সংস্কৃতির আলো যত জ¦লবে, অন্ধকারের ক্ষেত্র তত সংকুচিত হবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।