আতর কিংবা সুগন্ধির ব্যবহার যুগ পরম্পরায়। চিরসবুজ এক বৃক্ষ আগর গাছ। এই গাছের নির্যাস থেকেই তৈরি করা হয় আতর বা সুগন্ধি। কৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক দুই উপায়েই আগর থেকে সুগন্ধি জাতীয় আতর বা পারফিউম উৎপাদন করা হয়। সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলাকে বলা হয় আগর-আতরের আঁতুড়ঘর।
আজ আমাদের ভ্রমণ গন্তব্য আগর-আতরের জন্য প্রসিদ্ধ স্থান সিলেটের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে। দুপুরে এসে আমরা এসে পৌঁছলাম। এলাকার প্রবীণ তাজ উদ্দিন শেখ ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রথমে আমরা তাজ উদ্দিন ভাইয়ের বাসায় গেলাম আগরের কাঠ দেখার জন্য। তাজ উদ্দিন ভাই প্লাস্টিকের বড় বক্স থেকে আগরের কাঠ দেখালেন। তিনি বললেন এই কাঠগুলো শ্রমিক দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে বিদেশে পাঠান। তবে এটি পারফিউম না। এর ধোঁওয়াটা তারা নেয়। তাজ উদ্দিন ভাই আগর কাঠের টুকরো পুড়িয়ে এর সুগন্ধি আমাদের নিতে দিলেন। অবাক করা বিষয় হলো প্রতিটি কাঠ পোড়ালে পরে একি গন্ধ পাওয়া যায় না। প্রতিটার গন্ধ আলাদা। এই কাঠগুলো কীভাবে সংগ্রহ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন সুজানগরের ভেতরে মেঠোপথ কিংবা পাকা সড়ক ধরে এগোলে দুপাশে চোখে পড়বে বাগানে সারি সারি আগর গাছ। বাড়ির আঙিনাতেও এ গাছ লাগিয়েছেন অনেকে। প্রতিটি পরিবার বংশপরম্পরায় এই গাছ লাগিয়ে আসছেন। বড়লেখায় পাহাড়গুলোতেও আগরের গাছ পাওয়া যায়। আগর গাছকে আরবিতে বলে উদ। আগর গাছ থেকে কাঠ বের করার পর তার থেকে যে আবর্জনা বের হয় তা থেকেও আতর বের হয়। আবর্জনা থেকে বের হওয়া আতর বিক্রি হয় তোলা সাত হাজার টাকা করে। আতর গাছের গোড়াও দেশের বাইরে রপ্তানি হয়। এই গাছের গোড়া আরব দেশীয় লোকেরা শোপিস হিসেবে ব্যবহার করেন। এরপর তাজ উদ্দিন ভাইয়ের বাসা থেকে গেলাম উনার আতরের কারখানায়। আমরা বাঁশের সাঁকো পেড়িয়ে এগিয়ে চলছি। তাজ উদ্দিন ভাইয়ের কারখানার সামনে দেখতে পেলাম আগর গাছের কাঠ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে শুঁকাতে দেওয়া হয়েছে। এই কাঠগুলো পরে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এরপর আমরা কারখানার ভেতর প্রবেশ করলাম। তাজ উদ্দিন ভাই জানান, প্রথমে বাগান থেকে গাছ সংগ্রহ করে পরে লোহাগুলো সরিয়ে লাকড়ির মতো কেটে কুচি কুচি করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। ন্যূনতম ১৫ দিন থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে নির্দিষ্ট পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। ‘প্ল্যান্টের চুল্লিতে দিয়ে একই তাপমাত্রায় জ্বাল দেওয়া হয় অন্তত ৮ থেকে ১২ দিন। এরপর সংযোগ দেওয়া হয় আরেকটি সিলিন্ডারে, সিলিন্ডারটিকে আরেকটি বড় প্রবহমান পানি ভর্তি পিপার মধ্যে রাখা হয়। এখানে আগর তেলমিশ্রিত বাষ্প পানি অন্য পাত্রে গিয়ে পড়ে। আর পানি থেকে আগর তেল আলাদা হয়ে পানির ওপর ভেসে থাকে। এরপর একটি পাইপ দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়। প্ল্যান্টটিতে জ্বাল দেওয়া শেষ হলে ওই পিপা থেকে সংগ্রহ করা হয় আতর। আমরা হেঁটে হেঁটে আতর তৈরির পুরো প্রক্রিয়া দেখলাম।
এরপর আমরা বের হলাম পায়ে হেঁটে গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য। চলতি পথে চোখে পড়ল রাস্তার দুপাশে সারি সারি আগরগাছ। সচ্ছলতার ছাপ রয়েছে ঘরবাড়ির চেহারায়। গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই গড়ে উঠেছে কারখানা। বাড়ির উঠানের এক পাশে ফালি ফালি করে কাটা হচ্ছে আগরগাছ, আরেক পাশে চলছে কাটা টুকরো থেকে পেরেক খোলার কাজ। ঘরের বারান্দায় বসে নারীরা করছেন ফালি কেটে ছোট টুকরা করার কাজ। কারখানায় শ্রমিকরা সারি বাঁধা ডেকচিতে আগর জ্বাল দিচ্ছেন। দেখতে দেখতে সময় আমাদের জানিয়ে দিল এবার বিদায় নেওয়ার পালা। খুব ভালো একটা সময় কাটল তাজ উদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে। জানতে পারলাম আগর-আতর তৈরির খুঁটিনাটি।
কীভাবে যাবেন : মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে যেতে পারেন বাসে বা ট্রেনে। রূপসী বাংলা ও শ্যামলী পরিবহনে বড়লেখা যেতে পারেন। ট্রেন যায় উপবন ও জয়ন্তিকা। ট্রেন নামতে হবে কুলাউড়া স্টেশনে। সেখান থেকে বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে যেতে পারেন। সময় লাগবে এক ঘণ্টা। বড়লেখা সদর থেকে সুজানগর যেতে পারেন ট্যাক্সি, টেম্পো ও নিজস্ব গাড়িতে।