সংকট কাটিয়ে সেবায় ফিরছে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চালু হয়েছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদায়ন না থাকলেও নির্দিষ্ট দিনে অন্য উপজেলা থেকে চিকিৎসক এনে সিজারসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে।

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চালু হয়েছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদায়ন না থাকলেও নির্দিষ্ট দিনে অন্য উপজেলা থেকে চিকিৎসক এনে সিজারসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে।

এতে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের চিকিৎসার জন্য আর দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। হাসপাতালটির প্রতি রোগীদের আস্থাও বাড়ছে।

প্রায় তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের ৪২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৫ জন। ডেপুটেশন ও ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন ১২ জন। নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্য জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় কম।

তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালটির সেবার মান উন্নয়নে সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে ডা. রেজাউল করিম দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতালের বিদ্যমান সংকট চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ এবং আন্তঃবিভাগে ৩৫ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। কয়েক বছর আগের তুলনায় রোগীর এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্য চালু হয়েছে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) কর্নার। পাশাপাশি রয়েছে ব্রেস্টফিডিং কর্নার, শিশুদের কিডস কর্নার এবং বহির্বিভাগে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাসেবা। বিভিন্ন রোগের প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।

জরুরি ও আন্তঃবিভাগে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলেও যাতে জরুরি সেবা ব্যাহত না হয়, সে জন্য আন্তঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ ও নার্সদের ডিউটি রুমে আইপিএস স্থাপন করা হয়েছে। নারীদের নামাজের জন্য পৃথক স্থান তৈরির পাশাপাশি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, মসজিদ, পার্কিং শেড ও পাবলিক টয়লেটেরও উন্নয়ন করা হয়েছে।

হাসপাতালে ইসিজি, ডায়াবেটিস পরীক্ষার স্ট্রিপ, প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট, হৃদ্‌রোগ শনাক্তে কার্ডিয়াক ট্রপোনিন-আই ডিভাইস, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও ফিটাল ডপলার মেশিনের ব্যবস্থা রয়েছে। সাপে কাটা রোগীদের জন্য অ্যান্টিভেনম এবং অ্যান্টি-র‍্যাবিস ভ্যাকসিনও মজুত রয়েছে। দরিদ্র রোগীদের সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে হাসপাতালটির সংকট পুরোপুরি কাটেনি। মূল ভবন নির্মাণাধীন থাকায় এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও প্যাথলজি সেবা বর্তমানে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট। অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কম থাকায় বিদ্যমান জনবলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসকদের থাকার উপযোগী আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে চিকিৎসকদের ধরে রাখাও কঠিন। ফলে চিকিৎসক পদায়ন হলেও তাঁদের নিয়মিত অবস্থান নিশ্চিত করা অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের তুলনায় হাসপাতালের পরিবেশ ও সেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। নতুন সেবা চালু হওয়ায় অনেক রোগীকেই এখন আর চিকিৎসার জন্য খুলনা শহর বা অন্যত্র যেতে হচ্ছে না। তবে জনবল সংকটের কারণে কোথাও কোথাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

উত্তর বেদকাশী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মারুফা খাতুন বলেন, আগে হাসপাতালে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন চিকিৎসকের দেখা মেলে, বিনামূল্যে ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে।

চিকিৎসা নিতে আসা খলিলুর রহমান গাজী  জানান, তিন দিন আগে তিনি তাঁর মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং হাসপাতাল থেকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, দুই বছর আগের তুলনায় হাসপাতালের পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

গোবরা গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডা. রেজাউল করিম দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতালটি অনেক সুন্দর হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকভাবে সেবা দিচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, সেবার মান বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর অনেকগুলো ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকসহ শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। চলমান উন্নয়নকাজ শেষ হলে সেবার পরিধি আরও বাড়বে।

সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু,স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বন রক্ষায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের সমন্বয়ক মো.হাফিজুর রহমান বলেন, উপকূলের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে চলমান উদ্যোগগুলোর সুফল আরও বিস্তৃত হবে বলে। সংকটের মধ্যেও ধীরে ধীরে একটি কার্যকর ও আধুনিক উপজেলা হাসপাতাল হিসেবে গড়ে ওঠার পথে এগোচ্ছে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত