ঘাপলা করলেই এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০১ এএম

চলতি মাস থেকেই বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক যাওয়া শুরু হবে মালয়েশিয়ায়। বিনা পয়সায় নেওয়া হবে ১০ হাজারের মতো শ্রমিক। কোন আঙ্গিকে তারা যাবেন, সেই কৌশল নিয়েও চলছে আলোচনা। এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম চূড়ান্ত করেছে। তবে এ তালিকা নিয়ে চললে আলোচনা-সমালোচনা। একপক্ষ বলছে, পুরনো সিন্ডিকেটের আদলেই শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে। আর মালয়েশিয়া সরকার বলছে যাচাই-বাছাই করেই তালিকা চূড়ান্ত করেছে তারা। তারপরও শ্রমিক হয়রানি রোধে কঠোর হচ্ছে সরকার। কোনো এজেন্সি ঘাপলা করলেই তাৎক্ষণিক লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫৭ এজেন্সির কর্ণধারকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে মানব পাচারের অভিযোগও আছে।

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা বলছে, একাধিক এজেন্সি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠাতে বেশি অর্থ আদায় করেছে। এ নিয়ে দেশের সুনামও নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতির কারণে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া শুরু করে মালয়েশিয়া। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশটির শ্রমবাজার। এরপর দুই দেশের মধ্যে অনেক আলোচনার পর ২০২২ সালের আগস্টে আবার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হয়। সব এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার আন্দোলন হলেও তা হয়নি শেষ পর্যন্ত। প্রথমে ২৫ এজেন্সি শ্রমিক পাঠানোর দায়িত্ব পেলেও পরে এটি বাড়িয়ে ১০০ করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির তালিকায় মালয়েশিয়া চতুর্থ গন্তব্য। কিন্তু এরপরও এ দেশের শ্রমবাজার নিয়ে নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ ছিল। এর আগে ২০১৭-১৮ সালে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার পর বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হলে দুদক তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পায়নি। একইভাবে মালয়েশিয়া সরকারও তদন্ত শেষে অভিযোগটি সঠিক নয় বলে জানায়। ২০২২-২৪ মেয়াদেও কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে দায়েরকৃত মামলা তদন্তের জন্য বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুরোধে মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মানি লন্ডারিং বা মানব পাচারের মতো কোনো অনিয়ম হয়নি।

২০২২-২৪ মেয়াদে মালয়েশিয়ায় কর্মী গমনের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরের এক দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্সের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই রেমিট্যান্স এসেছে এক দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাবে বর্তমান অর্থবছর শেষে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার পৌঁছাবে বলে আশা করছে বায়রা। বায়রা সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক নিতে নানা উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকও করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর নতুন আশা সঞ্চার হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর আশ^াস কার্যকর করতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি পুরনো পদ্ধতিতে আগের ২৫ এজেন্সির কর্মী পাঠানোর খবরে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে। দল দুটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে আগের মতো দুর্নীতি না হয়। কোন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তা জানাতে হবে। তা ছাড়া বায়রার একটি অংশও তালিকার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমান সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে শিগগির মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে। বড় মাইলফলক হলো সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে বিনামূল্যে নিতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনো শ্রমিকের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করলেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। অন্তত ৫৭টি এজেন্সির মালিকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়ার আড়ালে কোনো অর্থ হাতালে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সিন্ডিকেটের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছি।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে মানব পাচার প্রতিরোধ। প্রস্তুত হচ্ছে সন্দেহভাজনদের তালিকা। অনেক এজেন্সি গ্রামাঞ্চল থেকে সহজ-সরল লোকদের টার্গেট করে ঢাকায় আনা হয়। এক দেশের কথা বলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অন্য দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপ-আমেরিকায় পাঠানোর নামে প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আবার উন্নত দেশে পাড়ি দিতে গিয়ে সাগরে সলিল সমাধি হচ্ছে অনেকের। এসব ঘটনার সঙ্গে ট্রাভেল ও রিক্রটিং এজেন্সির যোগসাজশ থাকায় সরকার হার্ডলাইনে গেছে। তালিকাভুক্ত এজেন্সিকে নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে মানব পাচারকারীদের একটি তালিকা প্রায় প্রস্তুত করে এনেছে পুলিশের দুটি বিশেষ ইউনিট। ঢাকার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে থাকা এজেন্সির অফিসের তথ্য আনা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ আছে, সেগুলোকে আলাদাভাবে নজর দিচ্ছে পুলিশ। তা ছাড়া এজেন্সি মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্যও নেওয়া হচ্ছে।   

পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বে নারী-শিশুসহ প্রায় আড়াই কোটি মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে। বিশে^র অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পাচারে ঘটনা বেশি। গ্রামাঞ্চল থেকে লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে লোকজনকে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাচারকারীদের দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। পাচারকারীদের মধ্যে অনেক রাজনীতিবিদ আছেন। তারা প্রভাবশালী নেতাদের দোহাই দিয়ে অপকর্ম করে যাচ্ছেন। 

সিআইডির তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ইতালি, ফ্রান্স, ভারত, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে নারী-শিশুসহ অনেক মানুষকে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে মানব পাচার চক্রের সদস্যদের অবৈধ কার্যক্রম চলছে। লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, স্পেন পাঠানোর কথা বলে পাচারকারী চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইউরোপে নিতে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দালালরা লিবিয়ায় পাঠায়। পরে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় করে ইতালি পাঠায়। এতে প্রায়ই সলিল সমাধির ঘটনা ঘটে।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া এমন তথ্য দিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তবে এ দাবি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রতিনিধিত্ব করে না বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ছয় মাসে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক নিয়োগ করবে বলে বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রীর দাবি সম্প্রতি সামনে এসেছে। কিন্তু সেরি ফাহমি ফাদজিল জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত