জ্বালানি সংকট উত্তরণে সরকার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৫ এএম

চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্লোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কর্মপরিকল্পনাসমূহ হচ্ছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্স শক্তিশালীকরণ, প্রোডাশন শেয়ারিং কন্টাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপসমূহ খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং চার হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। বাপেক্স শক্তিশালীকরণে আরও দুটি নতুন রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

এলএনজির অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে এ টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি (গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব হবে মর্মে আশা করছি। ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পায়রা বা মোংলাবন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন দুয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’

নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্যসমূহ যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপণীয় সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং ২ শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা করে ক্রয় করবে। এ সুবিধা-পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।

প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে।

মনিরুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে। দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ছয়টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা-১০ আসনের মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য বর্তমান সরকারের জাতীয় বাজেট বক্তৃতা ২০২৬-২৭-এ সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ লক্ষ্যকে শুধু জিডিপির আকার বৃদ্ধির লক্ষ্য হিসেবে নয়; বরং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের সমন্বিত রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মাহফুজা হান্নানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দেশের সমগ্র আকাশসীমার নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন বন্ধ করে স্বতন্ত্র রানওয়ে বা ঘাঁটি নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। এ ছাড়া অপর প্রশ্নের জবাবে দেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে আধুনিকায়ন, সাইবার হামলা ও নতুন বহুমাত্রিক হুমকি মোকাবিলায় দেশীয়ভাবে ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংসদকে অবহিত করেন সরকারপ্রধান।

ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি তা দেশের জন্য ভালো হবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কিছু বসতবাড়ি আছে, সেখানে কৃষিজমি আছে। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য, অবশ্যই সবচেয়ে আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে সেই মানুষগুলোকে আগে স্থানান্তর করা যায়। তাদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে, তাদের যাতে আয়-রোজগার বন্ধ না হয়, বরং সেই প্রকল্প গ্রহণ করলে প্রকল্প থেকেও যাতে তারা কোনো না কোনোভাবে লাভবান হতে পারে, সেসব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেই এবং অবশ্যই পরিবেশের যে বিষয়টি আছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত