নেপালের বন্যা কেন ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

নেপালের ভয়াবহ বন্যা এমন এক ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে, যা দেশটির সীমানায় থেমে নেই। ভারত ও নেপাল হিমালয় থেকে নেমে আসা বহু নদী ভাগাভাগি করে। তবে নেপালে বন্যা হলেই তার সরাসরি প্রভাব ভারতের ওপর পড়ে, বিষয়টি এতটা সরল নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর বিবিসির।    

কিছু বন্যার পানি পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসতে পারে। সঙ্গে নিয়ে আসতে পারে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমতলে পৌঁছানোর পর পানির স্রোতের তীব্রতা অনেকটাই কমে যায় এবং তা তুলনামূলকভাবে সাধারণ বন্যায় রূপ নেয়।

ভারতে সেই পানি কতটা বড় দুর্যোগ সৃষ্টি করবে, তা শুধু নেপালে কতটা বৃষ্টি হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না। ভারতের অংশে বৃষ্টিপাত, নদীর পানির স্তর, বাঁধ ও নদীভাঙন রোধে নির্মিত অবকাঠামো, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন সবকিছুই এর প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

তাই নেপালের বন্যা ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবে এর কারণ শুধু এই নয় যে পানি সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। মূল উদ্বেগ হলো দুই দেশ একই বিশাল এবং ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠা হিমালয়-উৎসারিত নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। 

নেপালে ৬ হাজারেরও বেশি নদী ও ছোট-বড় জলধারা রয়েছে। এর অধিকাংশই দক্ষিণমুখী হয়ে ভারত ও পরে গঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

নেপালের নদী ব্যবস্থার মধ্যে তিনটি প্রধান নদী অববাহিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পূর্বাঞ্চলের কোসি, মধ্যাঞ্চলের গণ্ডক এবং পশ্চিমাঞ্চলের কর্ণালী। ভারতে এগুলো যথাক্রমে কোসি, গণ্ডক ও ঘাঘরা নামে পরিচিত। এছাড়া পশ্চিম সীমান্তজুড়ে প্রবাহিত মহাকালী নদী ভারতে শারদা নামে পরিচিত। 

এর বাইরে শিবালিক ও চুরে পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রায় এক ডজন ছোট নদী রয়েছে। বাগমতী, কমলা, রাপ্তি ও বাবাই তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব নদী তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও ছোট ও খাড়া অববাহিকার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত এবং অনেক বেশি অনিশ্চিত বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।

হাইড্রোলজিস্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞ মনীশ শ্রেষ্ঠার মতে, নেপাল থেকে ভারতের সমতলভূমিতে সাত থেকে নয়টি বড় নদী প্রবেশ করেছে। এসব নদীই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ।

ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনও কোসি, গণ্ডক, বাগমতী ও ঘাঘরাকে ভারত-নেপালের মধ্যে প্রবাহিত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বিহারই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজ্যটির উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা সরকারি হিসাবে বন্যাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত।

উত্তর বিহারে যেসব বড় নদী প্রায়ই বন্যা সৃষ্টি করে, সেগুলোর প্রায় সবই নেপাল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত কোসি—যাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘বিহারের দুঃখ’ বলা হয়। এরপর রয়েছে গণ্ডক, বাগমতী ও কমলা।

ফলে নেপালে বন্যার পরিস্থিতি খারাপ হলে তার প্রভাব সীমান্তের ওপারেও পৌঁছাতে পারে। তবে সেই প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ধারণ করে দুই দেশের পুরো নদী অববাহিকার সম্মিলিত পরিস্থিতি। এ কারণেই নেপাল ও ভারতের জন্য সীমান্তের দুই পাশে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা এবং বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত