অর্থনীতির কঠিন চালচিত্র: গৌরী সেন নয়, টাকা দেবে জনগণ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

‘টাকা লাগে দেবে গৌরী সেন’—বাঙালি সমাজে বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি প্রয়োজনের সময়ে অর্থের জোগানদাতাকে নির্দেশ করে। রূপক অর্থে আমাদের দেশেও এমন বহু গৌরী সেনের উপস্থিতি রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল রেমিট্যান্সের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয় এবং নিষ্ক্রিয় অলস পুঁজি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকার যদি সঠিকভাবে বন্ড ছেড়ে সাধারণ মানুষের এই অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা এবং ঋণের চাপ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।

কেবল ভোটের দিনেই নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশ সিঙ্গাপুরের মতো দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা থাকলে অর্থের সংকট কখনো বড় বাধা হতে পারে না, যেমনটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদা ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ তত্ত্বে বোঝাতে চেয়েছিলেন।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও উন্নত-উন্নয়নশীল দেশ বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর ভরসা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এর বড় উদাহরণ। মার্কিন সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রির মাধ্যমে নিজ নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ ধার নেয়, আর জাপান সরকারের ঋণের সিংহভাগই আসে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। বাংলাদেশও ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে এই পথ অনুসরণ করে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কতিপয় ব্যাংক মালিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে অর্থ পাচারের ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন তাদের গচ্ছিত অর্থ প্রয়োজনমতো ফেরত পাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে এক নাগরিকের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—আগের দিনের অস্ত্রধারী ডাকাতরা এখন সুট-কোট পরে এসি রুমে ব্যাংক বসিয়ে নানা প্রলোভনে সাধারণ মানুষের আমানত হাতিয়ে নিচ্ছে।

প্রায়ই গণমাধ্যমে খবর আসে অমুক এনজিও মানুষের টাকা মেরে পালিয়েছে, তমুক এনজিও মানুষের টাকা মেরে পালিয়েছে। সরকার যদি জনগণের এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে মানুষ আর নিঃস্ব হবে না। সাধারণ মানুষ এতে যেমন উপকৃত হবে, তেমনি সরকারও লাভবান হবে।

বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট চরমে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়ির মালিক ও সিএনজি চালকরা। এতে করে মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানালেন, বিদ্যুৎ স্টেশনগুলো তো রয়েছে; কিন্তু এসব স্টেশন চালানোর জন্য জ্বালানি নেই। জ্বালানি আনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন, অথচ সরকার রয়েছে অর্থসংকটে। গ্যাস ও জ্বালানি তেল পর্যাপ্ত আনতে পারলে এসব বিদ্যুৎ স্টেশন চালানো যাবে।

এমন নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেই বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা করা সরকারের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি ময়মনসিংহে এক মতবিনিময় সভায় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জ্বালানির এই পুঞ্জীভূত সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয় এবং ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। এই কঠিন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে অভিনব পরামর্শও আসছে—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বা বড় বড় মেগা প্রজেক্টের নামে বিশেষ বন্ড বা সিকিউরিটিজ ছেড়ে জনগণের অলস অর্থ কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বা সামাজিক যেকোনো সংকট উত্তরণে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আস্থা যে প্রধান চালিকাশক্তি, তা সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান থেকেই প্রমাণিত হয়েছে।

এদিকে, চরম অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে চলা সরকারের সামনে নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশ বা প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকাই চলে যাচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি বা প্রণোদনা খাতে। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে শুধু এ খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অথচ বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তার ওপর নির্ভর করে জ্বালানি ও সার আমদানির মতো জরুরি খরচ সামাল দিতে হচ্ছে। একদিকে নতুন বেতন কাঠামো, দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয়ের বিশাল ফারাক—সব মিলিয়ে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের যে লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তার জন্য প্রায় ৪৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অতীতের গতির তুলনায় অত্যন্ত দুরূহ।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে কেবল বিদেশি ঋণ বা সাহায্যের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকে পুঁজি করে সঠিক পরিকল্পনাভিত্তিক অভ্যন্তরীণ বন্ড ব্যবস্থার প্রচলন এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলেই কেবল এই গভীর অর্থনৈতিক জট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

--

লেখক: রেজাউল করিম লাবলু

বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক দেশ রূপান্তর

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত