আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেই ‘জনতার বাজার–১’-এ তালা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম

স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চালু হওয়া ‘জনতার বাজার–১’ এক বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, বাজারটি নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে তাদের অনুপস্থিতিতে প্রধান ফটকে তালা লাগিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।

এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাজারটির উদ্যোক্তা ও কর্মীরা। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্রেতাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, বাজারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

২০২৫ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে ‘জনতার বাজার–১’ চালু হয়। বাজার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তাকে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাঁদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শুরু থেকেই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে তুলনামূলক কম দামে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও ছিল বাজারটির অন্যতম উদ্দেশ্য। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, চালুর পর থেকেই স্থানীয় মানুষের মধ্যে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তবে বাজার পরিচালনা নিয়ে একপর্যায়ে প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা আদালতের শরণাপন্ন হন।

উদ্যোক্তাদের দাবি, আদালত তাদের পক্ষে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের লোকজন বাজারে এসে তাঁদের অনুপস্থিতিতে প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এতে বাজারটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

উদ্যোক্তা সানোয়ার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে অসহযোগিতা ও সমন্বয়হীনতার মধ্যেও বাজারটিকে সেবামূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

তিনি বলেন, বাজার পরিচালনার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্য সংগ্রহ ও কর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তারা নিজেদের অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেছেন। বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত কর্মী, কৃষক ও ভোক্তারাও ক্ষতির মুখে পড়বেন।

আরেক উদ্যোক্তা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শুধু লাভের জন্য বাজারটি গড়ে তুলিনি। স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে পণ্য নিশ্চিত করা এবং কৃষককে ন্যায্য মূল্য দেওয়াই ছিল অন্যতম লক্ষ্য। প্রশাসনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অসহযোগিতার মধ্যেও আমরা কার্যক্রম চালিয়ে গেছি।’

নিয়মিত ক্রেতাদের কয়েকজন জানান, আশপাশের অন্যান্য বাজারের তুলনায় ‘জনতার বাজার–১’-এ কিছু পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক পরিবার বাজারটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। বাজারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের এখন অন্য বাজারে যেতে হবে।

একজন ক্রেতা বলেন, ‘স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য বাজারটি বেশ উপকারী ছিল। কোনো সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। বাজার বন্ধ করে দিলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন সাধারণ ক্রেতারা।’

এদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এর আগে কামরাঙ্গীরচরে ‘জনতার বাজার–২’-এর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, সমন্বয়ের অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে বাজারটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনি। সরকারি অর্থে তৈরি ওই বাজারের অবকাঠামো বর্তমানে অযত্ন ও অব্যবহারে পড়ে আছে বলেও তাঁদের দাবি।

তবে ‘জনতার বাজার–১’ বন্ধের কারণ নিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এডিসি ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘জনতার বাজার–১-এর সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি ছিল, তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা সকালে তালা লাগিয়েছি।’

প্রশাসনের এ বক্তব্যের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দাবির স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা অবস্থায় বাজারে তালা লাগানো হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাজারটি বন্ধ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় আদালতের স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা, চুক্তির মেয়াদ এবং বাজার বন্ধে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয় সামনে এসেছে। বাজারটি নিয়ে প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের বিরোধের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, তা এখন দেখার বিষয়।

উদ্যোক্তাদের মতে, বাজার পরিচালনায় কোনো অনিয়ম বা সমস্যা থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পরিচালন কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কৃষক, উদ্যোক্তা, কর্মী ও ভোক্তা—সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত