ডেঙ্গুর প্রকোপে উদ্বেগ বাড়ছে ময়মনসিংহ নগরীতে। বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা চালু করা হলেও রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক-নার্সদের ব্যস্ততা বেড়েছে। রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৭০৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১২ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৪৪ জন। এর মধ্যে ১০১ জন পুরুষ, ৩০ জন নারী ও ১৩ জন শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ২৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ সময়ে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
হাসপাতালের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে তা বাড়তে থাকে। জুনে ৫৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬০ জন রোগী ভর্তি হন। আগস্টে ৯৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে দুজন, আগস্টে চারজন এবং সেপ্টেম্বরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
নগরীর কালিবাড়ী কবরখানা এলাকার বাসিন্দা মো. নাহিদ গত ২৯ আগস্ট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেট কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে রক্ত দিতে হচ্ছে। শারীরিক অবস্থা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি আরও জানান, তার বাসার আশপাশের অনেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
নগরীর কাচিঝুলি এলাকার রোমান খান বলেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ও ড্রেনেজ সমস্যার কারণে পানি জমে থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে। মশা নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
এদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসক, নার্সসহ আলাদা জনবল নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনা টিম কাজ করছে।
তিনি জানান, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় ফোকাল পারসন হিসেবে অধ্যাপক ডা. এমদাদ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোকাল পারসন হিসেবে ডা. সেলিম দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের তত্ত্বাবধানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিয়মিত পরিস্থিতি তদারকি করছেন।
ডা. মাইনউদ্দিন খান আরও জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। বর্তমানে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো সংকট নেই।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এস কে দেবনাথ জানান, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফগার মেশিন ব্যবহার করে মশা নিধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে বলে জানান তিনি।