স্যালাইন হাতে অসুস্থ চিকিৎসক, তবু থামেনি রোগী দেখা 

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০২ পিএম

রাত তখন প্রায় ১২টা। ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক রোগী আসছেন। কারও অসুস্থতা গুরুতর, কেউ দুর্ঘটনায় আহত, আবার কেউ স্বজনকে নিয়ে ছুটে এসেছেন চিকিৎসার আশায়। এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. ইরফান মাহমুদ।

তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়া হয়। শরীরে স্যালাইন, হাতে ক্যানুলা—স্বাভাবিকভাবে তখন তার বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ কমেনি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, হাতে ক্যানুলা ও শরীরে স্যালাইন চলা অবস্থাতেই চিকিৎসকের চেয়ারে ফিরে রোগী দেখা শুরু করেছেন ডা. ইরফান মাহমুদ।

নিজে চিকিৎসাধীন থেকেও রাত প্রায় ৩টা পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা দেন তিনি। পরে অন্য একজন চিকিৎসক জরুরি বিভাগের দায়িত্ব নিলে বাসায় ফেরেন ডা. ইরফান।

এই ঘটনা শুধু একজন চিকিৎসকের দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত নয়, ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের দীর্ঘদিনের চিকিৎসক ও নার্স সংকটের চিত্রও সামনে এনেছে। ২০১৯ সালে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও নতুন শয্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পুরোনো ১০০ শয্যার জনবল কাঠামোর ১৭৯টি পদের মধ্যে ৭৬টি পদই শূন্য রয়েছে বলে জানা গেছে। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে কোনো মুহূর্তেই সেবা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ফলে একজন চিকিৎসক অসুস্থ হয়ে পড়লেও তার জায়গায় তাৎক্ষণিক দায়িত্ব নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত জানানো হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের কারণে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স সংকটও প্রকট। রোগীর তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স না থাকায় সেবা দিতে তাদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিলেও কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে সীমিত জনবল দিয়ে।

এদিকে হাসপাতালের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অবস্থাও উদ্বেগজনক। ছয় শয্যার আইসিইউ ইউনিট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল, অ্যানেসথেটিস্ট ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেটি কার্যকরভাবে চালু করা যাচ্ছে না। ফলে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন এমন রোগীদের অনেক সময় বরিশাল বা ঢাকায় পাঠাতে হয়। 

ভোলা দ্বীপজেলা হওয়ায় সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত অন্যত্র নেওয়াও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। এতে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতালে পদায়ন করা চিকিৎসকেরা যোগদান করলে জনবল সংকট অনেকটাই কমবে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু পদায়ন নয়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, বিশেষজ্ঞ জনবল ও কারিগরি কর্মী নিশ্চিত করে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো হোক।

স্যালাইন হাতে অসুস্থ অবস্থায় ডা. ইরফান মাহমুদের রোগী দেখার দৃশ্য একজন চিকিৎসকের মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসনীয় উদাহরণ। তবে একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে—একজন চিকিৎসক অসুস্থ হলে তার দায়িত্ব নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল কি হাসপাতালটিতে রয়েছে?

ভোলার মানুষের প্রত্যাশা, কোনো অসুস্থ চিকিৎসককে যেন নিজের চিকিৎসা চলার মধ্যেও রোগীর সেবায় ফিরতে না হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিশ্চিত করে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে ব্যক্তিগত ত্যাগ নয়, শক্তিশালী জনবল কাঠামোর ওপর নির্ভর করেই জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত