জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিয়ে বিল পাস হয়েছে।
আজ রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা বিল ৩টি পাসের জন্য উপস্থাপন করেন। বিলগুলোর কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে দুই দফা ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন বিলকে কালো আখ্যায়িত করে বিরোধীদল মুখে কালো কাপড় বেধে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে। এরপরে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কন্ঠভোটে পাস হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রথমে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ নিয়ে আলোচনা হয়। বিল নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন। বিলটির কয়েকটি বিধান কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে দাবি করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মুসলমানদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কোরআনের সূরা নিসার ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম দুটি আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টনের মূলনীতি এবং পরের দুটি আয়াতে এর পরিণতি সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উইল বা হেবার ক্ষেত্রে যার নামে সম্পত্তি দেওয়া হবে, তাকে মালিকানা ভোগের সুযোগ দিতে হবে। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হেবা নয়, বরং ওসিয়তের আওতায় পড়ে। ওসিয়তের ক্ষেত্রেও কাকে করা যাবে এবং সর্বোচ্চ কত অংশ করা যাবে, সে বিষয়ে কোরআন-হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, আইনটি মানুষের ঈমান-আকিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়া এটি পাস করা হলে সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত হকদারের অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে বিলটি চলতি অধিবেশনে পাস না করে শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর দাবি জানান তিনি।
ইসলামী ফাউন্ডেশনকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করারও প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট আলেম ও স্কলারদের নিয়ে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদের কাছে সুপারিশ দিতে পারে।
এরআগে জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনও বিলটির বিরোধিতা করেন। তাঁর অভিযোগ, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে সম্পত্তি দানের সুযোগ তৈরি হলে মুসলিম উত্তরাধিকার বা মিরাসের বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, দেশের প্রখ্যাত আলেমরা এ ধরনের বিধানকে ইসলামী আইনের পরিপন্থী বলে মত দিয়েছেন। সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো সামাজিক সমস্যার সমাধান প্রয়োজন হলেও এর জন্য ইসলামি পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর কোনো যুক্তি নেই। তিনি বলেন, মা-বাবার অধিকার সুরক্ষায় ২০১৩ সালে আইন করা হয়েছে। সেই আইনের মাধ্যমেই তাঁদের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নতুন করে এমন বিধান করার প্রয়োজন নেই, যা উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, বাবা-মাকে সন্তানদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল থেকে রক্ষায় বিলটি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তবে সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ রাখা উচিত। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে। দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিলটির উদ্দেশ্য উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করা নয়। বরং সম্পত্তি দান করার পর দাতার জীবনকাল পর্যন্ত তাঁর ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিলটির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি দানের পর দাতার আজীবন ভোগাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। নতুন বিধানের মাধ্যমে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। বিলটিতে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, এই বিধান সব ধর্মাবলম্বীর জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা কিংবা অন্য কোনো স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়বে না। আলোচনার এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টা ৫৬ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধন করে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার ধরে রাখতে পারবেন। এ জন্য আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে এই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য হবে। বিল পাসের কয়েক মিনিট পর বিরোধী দল সংসদে ফিরে আসেন।
এরপর মানবাধিকার কমিশন বিল পাসের কার্যক্রম শুরু হয়। আইনমন্ত্রী এই বিল পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা। এসময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে ‘দুর্বল’ আইন পাসের জন্য জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে যখন বিলগুলো বাতিল করা হয়, তখন বলা হয়েছিল যে, অত্যন্ত শক্তিশালী ও আরও ভালো আকারে তারা নিয়ে আসবে। মানবাধিকারসংক্রান্ত যে বিলটা এসেছে, সেখানে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনকে একটা ইউনিফর্ম অথরিটি দেওয়া হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মানবাধিকারসংক্রান্ত বিলে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যদি কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তার তদন্ত করতে পারবে।
শফিকুর রহমান বলেন, আইনের দ্বৈত প্রয়োগ হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী রাষ্ট্রের কর্মচারী, কিন্তু তারা এ দেশের নাগরিক। একই অপরাধে একজনের জন্য সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আরেক জায়গায় আটকা পড়ে যাবে—এটা হতে পারে না।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুর্বল আইন পাস করার অংশীদার হবো না। আমরা এই আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি।’ জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ওয়াকআউট করার জন্য আপনাদেরও ধন্যবাদ।’ এরপরে বিল পাসের কার্যক্রম শুরু হয়।
এসময় বিল নিয়ে রুমিন ফারহানা চারটি প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবগুলো হলো- ১. কমিশনের নির্দেশ অমান্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে ক্ষমতাবান কর্মকর্তা বা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক কিংবা আদালত অবমাননার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার’ আইনি ক্ষমতা দিতে হবে। ২. স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা: ‘কমিশনের তদন্তে কোনো কর্মকর্তা পুলিশ থাকবে না। এটি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ফরেনসিক ও তদন্ত ক্যাডারের মাধ্যমে।’ ৩. নিজস্ব প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল: দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো নিজস্ব প্রসিকিউশন উইং, আইনজীবী প্যানেল এবং বিশেষ মানবাধিকার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি বিচার পরিচালনার এখতিয়ার দিতে হবে। ৪. সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা: ক্ষমতাশালী মহলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় ‘উইটনেস প্রটেকশন’ বা আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে। তার প্রস্তাব কন্ঠভোটে নাকোচ হয়। পরে বিলটি পাস হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন। নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।
এরপর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসময় বিরোধী দল উপস্থিত ছিলো না। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে তিনি নীতিগতভাবে সমর্থন করেন। তবে তাড়াহুড়া করে বিলটি পাস না করে আরও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান তিনি। বিলটি সংশোধনের জন্য তিনি পাঁচটি প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, গুমকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সুস্পষ্টভাবে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যাতে অতীতে সংঘটিত গুমের বিচার নিশ্চিত করা যায়। দ্বিতীয়ত, কোনও নাগরিককে সর্বশেষ কোন বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেল, ওই বাহিনী তাদের কাছে নেই-তা প্রমাণের প্রাথমিক দায়িত্ব সেই বাহিনীকেই বহন করতে হবে। তৃতীয়ত, সামরিক ও বেসামরিক বিচারিক দ্বন্দ্ব এড়াতে বিলে সুস্পষ্ট নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ রাখতে হবে। যাতে কোনও বাহিনীর সদস্য বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে না পারেন। চতুর্থত, কাউকে আটকের সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজে এন্ট্রি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে মানবাধিকার কমিশন বা আদালত তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নজরে আনতে পারে। পঞ্চমত, অভিযোগের অনধিক ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ ইস্যু বাধ্যতামূলক রাখতে হবে, যাতে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারকে দীর্ঘদিন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়।’
রুমিন ফারহানা বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আইন দায়সারা বা তাড়াহুড়ো করে পাস না করে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন আগের অধ্যাদেশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তি বা পরিবারের আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব জটিলতা ছিল। নতুন আইনে তাঁদের সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গুমের বিভিন্ন ধরনকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা জোরপূর্বক গুমের বিচার আগের মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে থাকবে। গুমের অন্যান্য ধরনকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আইনে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি না থাকলেও ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দায়ের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা নিয়েও সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কমিশন স্বাধীনভাবে গুমের ঘটনা তদন্ত করতে পারবে। কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিনা নোটিশেও সংশ্লিষ্ট স্থানে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। তদন্তে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য করার বিষয়টিও বিলে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রণয়নের আগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে মতামত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পাশাপাশি দেশের বাস্তবতা ও স্থানীয় সংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আইন পাসের মাধ্যমে গুমের অভিযোগের বিচার ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার পথ তৈরি হবে। পরে বিলটি সর্বসম্মতিতে পাস হয়। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপসযোগ্য নয়-এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে। বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট