রাজধানীর বনানী এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রাজ ক্লাসিক নামের একটি বাসের চালকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, ইসমাইলের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার সময় তার কোমরে থাকা জমি বিক্রির টাকার বান্ডিল দেখে ফেলেন ওই বাসের সুপারভাইজার। এরপর চালকের সঙ্গে পরিকল্পনা করে ইসমাইলকে হত্যা করে তারা টাকা হাতিয়ে নেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজন হলেন বাসচালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ও চালকের সহকারী মো. মনির হোসেন। গতকাল রবিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।
তিনি জানান, গত শুক্রবার সকালে ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধারের পর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনায় রাজু ক্লাসিক নামের একটি বাস প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়। পরে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসটি জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং চালকের সহকারী মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিগপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে যাত্রী হিসেবে বাসে তোলা হয়। একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু তার কাছে ভাড়া চাইলে তিনি কোমরে লুঙ্গির ভাঁজ থেকে ভাড়া বের করে দেন। তখন বাকি টাকাগুলো দেখে ফেলেন সুপারভাইজার সাজু। পরে সাজু বাসচালককে জানান, ওই যাত্রীর কাছে অনেক টাকা আছে এবং সম্ভবত তিনি কোনো ব্যাপারী। এরপর ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্তরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে ইসমাইলকে নিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে। একপর্যায়ে সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারী মিলে ইসমাইলের মুখ এবং হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। সেই সঙ্গে একটি গামছা পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করে অভিযুক্তরা বাসটি নিয়ে বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বনানীতে আসেন। এখান থেকে তারা ইউটার্ন করে আবার বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় ইসমাইলের মৃতদেহ সেখানে ফেলে যান। ভুক্তভোগীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা থাকলেও অভিযুক্তরা জিজ্ঞাসাবাদে পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। তারা বলেছেন, আড়াই লাখ টাকার মতো তারা নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী বাসে একমাত্র যাত্রী ছিলেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) বলেন, ভুক্তভোগী ইসমাইলকে আসামিরা ঘুমিয়ে যেতে বলেন। তাকে বলা হয়, নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে তাকে ঘুম থেকে ডেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। ইসমাইল ঘুমিয়ে গেলে বাসের অন্য যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে ভুক্তভোগীর ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে তাকে নির্ধারিত স্থানে না নামিয়ে হত্যা করা হয়।
সুপারভাইজার-হেলপারের স্বীকারোক্তি, চালক রিমান্ডে : গতকাল দুপুরের পর তিন আসামিকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বনানী থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম তালুকদার। এ সময় আসামি সাজু ও মনির স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন তিনি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর আসামি সাজুর এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ছিদ্দিক আজাদ আসামি মনিরের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অপর আসামি চালক সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। সেই আবেদনের শুনানি শেষ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।