সন্তানকে ফিরিয়ে দিন...

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৯ এএম

২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট, গোধূলিবেলায় বড় ভাই রিফাতের (১০) সঙ্গে রাজধানীর পল্লবীর হাজী মার্কেট-সংলগ্ন বাসার সামনে খেলছিল ৩ বছরের রূপা আক্তার। মাগরিবের আজান কানে আসতেই ছোট বোনকে সেখানে রেখে নামাজ পড়তে পাশের মসজিদে যায় রিফাত। নামাজ শেষে ফিরে এসে রিফাত দেখে, যেখানে রূপাকে রেখে গিয়েছিল, সেখানে সে নেই। রিফাত ভেবেছিল, হয়তো রূপা বাসায় চলে গেছে। অন্যদিকে রূপার মা স্বপ্না আক্তারও ভেবেছিলেন, মেয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাসার সামনে খেলছে। রিফাতকে একা বাসায় ফিরতে দেখে মেয়ের কথা জানতে চান স্বপ্না। তখন রিফাতও উল্টো মাকে জিজ্ঞেস করে, রূপা কোথায়?

সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় রূপাকে খোঁজাখুঁজি। প্রতিবেশীদের বাসা, আশপাশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা সবখানেই তন্নতন্ন করে খোঁজা হয় ছোট্ট রূপাকে। মাইকিং করা হয় পুরো এলাকায়। তবু কোথাও মেলেনি তার সন্ধান।

উপায়ান্তর না দেখে থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয় পরিবারটি। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেলেও রূপাকে খুঁজে দিতে পারেনি পুলিশ। সন্তান কোথায়, কেমন আছে এ প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আজও অপেক্ষায় আছেন মা স্বপ্না আক্তার। অপেক্ষায় দিন গুনছে ভাই রিফাত ও পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরাও।

ঘটনাটি বর্ণনা করে একমাত্র মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মঞ্চ থেকে নেমে শ্রোতার আসনে গিয়ে বসেন স্বপ্না আক্তার। ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। তার কান্না নাড়া দেয় উপস্থিত সবাইকে। কিন্তু তাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা কারও জানা নেই। কারণ, মঞ্চে শ্রোতার আসনে থাকা সবার গল্পই প্রায় এক। কেউ এসেছেন নিখোঁজ সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাতে, কেউ আদরের ছোট ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্তির কথা বলতে, আবার কেউ এসেছেন সন্তানকে খুঁজে পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হয়রানির শিকার হওয়ার বর্ণনা দিতে।

গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল ইসলাম মিলনায়তনে এমনই করুণ দৃশ্য দেখা গেছে। মুন অ্যালার্টের (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) আয়োজনে সংবাদ সম্মেলনটি করেন নিখোঁজ শিশুদের পরিবার। একে একে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা মঞ্চে উঠছেন, আর চোখের পানি মুছতে মুছতে মঞ্চ ছেড়েছেন।

চলতি বছরের ২৮ মার্চ দক্ষিণখান থেকে নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের শিশু আরাফাত হোসেন রিয়াদ। কোথাও না পেয়ে দক্ষিণখান থানায় জিডি করতে যান রিয়াদের বাবা মো. আনোয়ার হোসেন। পুলিশ জানায়, ২৪ ঘণ্টা পর আসবেন, এখন খুঁজে দেখেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায়ও রিয়াদকে না পেয়ে ফের থানায় যান তিনি। এবার পুলিশ জিডি নিতে গড়িমসি করতে থাকে। অনেক অনুরোধ করার পর জিডি নেয়। কিন্তু জিডি দায়েরের চার মাসের বেশি সময় পার হলেও একবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি, তদন্তের জন্য তাদের কাছে যায়নি। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ উল্টো তাদের বলে, এত বড় বাচ্চা এমনি এমনি চলে যাওয়ার কথা নয়; নিশ্চই আপনারা বাচ্চাকে চাপ প্রয়োগ করতেন। সন্তানকে ফিরে পেতে সহায়তা চেয়ে পুলিশের কাছে যেন আমরা আসামি হয়ে গেলাম এমনটি জানান রিয়াদের বাবা আনোয়ার হোসেন।

২০০৮ সাল থেকে ৮ বছর বয়সী তানজিলাকে খুঁজে ফিরছে তার পরিবার। লালবাগের শহীদ নগরে মামাতো ভাইদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সে। টানা ১০ দিন ঢাকাজুড়ে মাইকিং ও পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মেলেনি সন্ধান। দুই ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোনকে হারিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভাই মো. শাকিল।

শাকিল জানান, বাবা মারা গেছেন, মা এবং ছোট ভাই সৌদিপ্রবাসী। মায়ের অনুপস্থিতিতে তানজিলা মামার কাছে থাকত। নিখোঁজের পর পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েও কোনো সহযোগিতা পাননি তারা। আক্ষেপ করে শাকিল বলেন, নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা কি শুধু পরিবারের দায়িত্ব, নাকি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে? তিনি বলেন, প্রভাবশালী কারও সন্তান নিখোঁজ হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান হয়; কিন্তু সাধারণ পরিবারের সন্তান নিখোঁজ হলে তাদের কথা শোনারও কেউ থাকে না। তানজিলাকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পৃথক একটি ইউনিট গঠনের দাবি জানান তিনি।

নিখোঁজ ছোট ভাই আজমাইনকে খুঁজে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাতে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে এসেছেন বড় ভাই আবু আজম। আজমাইনের ছবি সম্বলিত ফটোকার্ড হাতে ডায়াসে দাঁড়াতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনিও। চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাইকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। নবম শ্রেণিতে পড়–য়া আজমাইন গত ৪ জানুয়ারি নিখোঁজ হয়।   

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্তত ৪০টি পরিবার দীর্ঘ অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর নিখোঁজ সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও প্রিয়জনের খোঁজ পাননি তারা। পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও পদে পদে হয়রানি আর পুলিশের চরম উদাসীনতার অভিযোগও তুলে ধরেন তারা। শুধু নিখোঁজদের কথাই নয়; নিখোঁজের পর পুলিশের সহায়তা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার ঘটনাও তুলে ধরে কয়েকটি পরিবার।

তাদেরই একজন মো. আলিফ (৫)। গত বছরের ২৩ জুন টঙ্গি থেকে নিখোঁজ হয় সে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পরিবার জানতে পারে, এক নারী রিকশায় করে আলিফকে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি জানিয়ে থানায় গেলেও পুলিশ অভিযোগ, জিডি কিংবা মামলা নিতে চায়নি। বরং মাইকিং করে নিজেদেরই খুঁজতে বলে। পুলিশের সহায়তা না পেয়ে আলিফের ছবি দিয়ে ফেসবুকে একটি ‘শর্ট ভিডিও’ পোস্ট করেন তার বাবা মো. কাশেম। সেই পোস্ট দেখে আশুলিয়ার এক ব্যক্তি জানান, একটি পরিবারে আলিফকে তিনি দেখেছেন। সেখানে গিয়ে আলিফকে পান তার পরিবার। তবে যে পরিবারের লোকজন আলিফকে অপহরণ করেছে, তারা দাবি করে তার নাম আলিফ নয়, শাহিন। কাশেম বলেন, ‘আমরা আশুলিয়া থানায় গিয়ে পুলিশ নিয়ে আসি। কিন্তু পুলিশ ওই বাসায় গিয়ে শিশুর নাম শাহিন শুনে ফিরে আসে। অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও পুলিশ আলিফকে উদ্ধার করে দেয়নি। এরই মধ্যে আলিফকে নিয়ে ঝিনাইদহে চলে যায় অপহরণকারী পরিবারের নারী-পুরুষসহ পাঁচজন। আমরাও সেখানে যাই এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর ২৭ জুন কালীগঞ্জে তাদের সন্ধান পাই। সেখান থেকে আলিফকে উদ্ধার করি এবং অপহরণকারী পরিবারের তিনজনকে আটক করা হয়। তখন পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানান, ভারতে পাচার করতে তাহমিনা নামের একজন বোরখা পরে আলিফকে অপহরণ করেছিল। এরই মধ্যে বিক্রির সব প্রস্তুতি সম্পন্নও করে ফেলেছিল। কিন্তু অল্পের জন্য সেটি হয়নি।’

এ ঘটনায় টঙ্গী থানার এসআই বায়েজিত বাদী হয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। তবে মামলাটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে কিংবা আসামিরা কোথায় সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই কাশেমের কাছে।

মুন অ্যালার্টের প্রতিষ্ঠাতা সাদাত রহমান বলেন, তারা থানা থেকে নিখোঁজসংক্রান্ত জিডির কপি সংগ্রহ করেন এবং মুন অ্যালার্টে পোস্ট করেন। নিখোঁজ পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন তারা। এভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ ও অপহরণের শিকার শিশুকে তারা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত